আখতারুজ্জামান ইলিয়াস – মাত্র ২টি উপন্যাস—চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা।
5/5 - (1 vote)

মাত্র ২টি উপন্যাস—চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা। একটির সঙ্গে অন্যটির রচনা ও প্রকাশকালের ব্যবধান প্রায় ১০ বছর! ৫টি গল্পগ্রন্থ। উৎসব, যুগলবন্দি, খোঁয়ারি, দোজখের ওম, দুধভাতে উৎপাত, কান্না, রেইনকোট ইত্যাদি প্রকাশিত, অপ্রকাশিত, গ্রন্থিত, অগ্রন্থিত সবমিলিয়ে মোটে ৩১টি গল্প। মৃত্যুর পর প্রকাশিত ১টি প্রবন্ধের বই—সংস্কৃতির ভাঙা সেতু। ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা আরও কিছু সমাপ্ত অসমাপ্ত রচনা ও সাক্ষাৎকার—বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকারের এটুকুই সম্বল! হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন : ‘অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে একটা বিচিত্র, আচমকা, অচেনা সাহিত্য সৃষ্টি করে অকালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রস্থান করেছেন।’ তাঁর প্রস্থানের দিনটি আজও স্পষ্ট মনে আছে। রেডিও নিয়ে গ্রামের পুকুরপাড়ের দক্ষিণপূর্বকোণে বসে আছি। দিল্লি থেকে বাংলা সংবাদ। ‘খবর পড়ছি শঙ্কর মুখোপাধ্যায়।’ শঙ্কর মুখোপাধ্যায় কি? সম্ভবত। সেই খবরে আচমকা জানতে পারলাম, বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল, ইলিয়াস নেই! কথাকার অভিজিৎ সেন হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘চিলেকোঠার সেপাই’। এই বঙ্গে বইটি তখনও অপ্রকাশিত। পড়ে চমকে গিয়েছিলাম। ঢাকায় যাইনি কিন্তু ঢাকার প্রতিটি রাস্তা, আস্ত শহরটা, প্রায় গোটা বাংলাদেশ চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল। সেই শুরু, পরে তাঁর সব লেখা পড়েছি। ক্রমে ক্রমে বুঝেছি, মহাশ্বেতা দেবী যাঁকে বাংলাভাষার ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন সেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলাসাহিত্যে ক্রিটিক্যাল রিয়ালিজমের গুরু। কী অসামান্য দক্ষতায় তিনি ভাষাচাবুক প্রয়োগ করে মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। তথাকথিত অশ্লীল শব্দের উচ্চতম শ্লীল প্রয়োগ বাংলা সাহিত্যে এক নজিরবিহীন ঘটনা। হাসান আজিজুল হক মনে করেন : ‘বাংলা ভাষার যাবতীয় শব্দ পচিয়ে তৈরী হয়েছে একরকম রৌদ্র-পক্ক আরক। টলটলে স্ফটিকের মতো রঙ তার, ঝকঝকে ছুরির মতো ধার। কখনও মনে হতো এই ভাষা অতি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন খোলা বৈদ্যুতিক তার।’ অভ্যস্ত রুচি ও সংস্কারকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে ইলিয়াস মুহূর্তেই যেন পাঠকদেহ থেকে সমস্ত শোনিত শুষে নেন। বাংলা ধেনো শব্দের হিরেপ্ল্যাটিনাম ছড়িয়ে আছে তাঁর রচনার ছত্রে ছত্রে। ভাষার লৌহপিন্ডকে ইলিয়াস দুমড়ে মুচড়ে শান দিয়ে তাকে ইস্পাতে রূপান্তরিত করেছেন। এই ভাষানির্মাণ সোশ্যাল কনস্ট্রাকটিভিজমের এক চমৎকার উদাহরণ। পাঠকের অনভ্যস্ত কানে তিনি ছেঁকা দিয়েছেন। এসব শব্দ, শব্দজোড়, বাক্য, বাকাংশ্য ইলিয়াসের চরিত্রের কাছে প্রতিদিনের শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো সরল, সত্য ও স্বাভাবিক। পাঠক বিস্মিত। বিচলিত।অভিজিৎ সেন ঠিক ধরেছেন : ‘ ইলিয়াস তাঁর পাঠককে যেন তাড়াতে থাকেন। বারবার তাড়া খাওয়ার পর যে কজন টিকে থাকে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বা ‘খোয়াবনামা’ তাদের উপহার দেয় এক বোঝা অস্বস্তি এবং বেশ কিছু বিস্ময়।’ আসলে পাঠককে চোখ পাল্টানোর সাহিত্য উপহার দিয়েছেন ইলিয়াস। অভ্যাসের ‘খোঁয়ারি’ ভাঙতে চেয়েছেন। ভেঙেছেনও। ইলিয়াস বিশ্বাস করতেন,’দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন না ঘটলে নতুন প্রকরণ খোঁজা আর নতুন নতুন ফন্দি বার করার মধ্যে পার্থক্য থাকে না।’ মধ্যবিত্তের রুচি ও সাহিত্যবৃত্তকে ভাঙার জন্য তিনি অশালীন যৌনতা এবং অপ্রচলিত-অভদ্র শব্দের দাপুটে প্রয়োগকে হাতিয়ার করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন : ‘sex নিয়ে সাহিত্য করা risky। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা লেজে গোবরে হয়ে যায়। যৌনতাকে আমি কোনো সময়েই glorify করার চেষ্টা করিনি।…আমি sex -এর পেছনে living মানে class কে দেখতে চাই, society কে দেখতে চাই।’ তাঁর প্রায় সমস্ত রচনায় বিশেষত ‘উৎসব’ বা ‘যুগলবন্দি’ গল্পে এই সত্য ধরা আছে। গৌণচরিত্র ইলিয়াসের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনসব চরিত্রকে, চরিত্রের মিছিলকে তিনি তুলে এনেছেন ক্ষেত্রবিশেষে যাদের নামটিও জগৎ সংসার ভুলে গেছে! কিন্তু সমাজ জীবনের বিশ্লেষণে এদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। হাড্ডি খিজির, হুরমতুল্লা, আসগর, জুম্মন, কুলসুম এবং অবশ্যই ‘তমিজের বাপ’। বিশ্বসাহিত্যে তমিজের বাপের মতো চরিত্রের আর একটিও নজির আছে বলে মনে হয় না। অভিজিৎ সেনের মতে : ‘ ইলিয়াসের প্রধান চরিত্রেরা যেন উষর প্রান্তরে বজ্রদগ্ধ তালগাছ, নিঃসঙ্গ, সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ সম্ভবনাহীন।’ কিন্তু স্বপ্ন-সত্য-সম্ভবনা সমস্তই বেঁচে থাকে ফুলজান বা সখিনাদের মতো বাংলা সাহিত্যে কলকে না পাওয়া এতকালের অবহেলিত চরিত্রগুলির মধ্যেই : ‘ফুলজানের বেটির মাথার ভেতরে বিজ বিজ করে কী। তাহলে এর মাথার এই বিজ বিজ আওয়াজ থেকে কথার কুশি বেরুবে, সেটাকে শোলোকে গেঁথে তুলবে কি এই সখিনাই? ভাত খাওয়া ছাড়া ছুঁড়ি আর বোঝে কী। এ কি আর শোলোক গাঁথতে পারবে?… মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে লম্বা তালগাছের তলায় পুরনো উই ঢিবির সামনে খটখটে শক্ত মাটিতে পাজোড়া জোরে চেপে রেখে ঘাড়ের রগ টানটান করে মাথা যতটা পারে উঁচু করে চোখের নজর শানাতে শানাতে সখিনা তাকিয়ে থাকে কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে জখম চাঁদের নিচে জ্বলতে থাকা জোনাকির হেঁসেলের দিকে।’ ০৪। ০১। ১৯৯৭ ইলিয়াস প্রয়াত। ২৭। ০১।১৯৯৭ শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন : ‘ইলিয়াস আজ নেই। এই ‘নেই’-এর কোনও সান্ত্বনাও নেই। কিন্তু ওসমান আছে—ওসমানের মাথায় বাসাবাঁধা খিজির আছে—তমিজের বাপ আছে : তার মেঘ তাড়ানো এখনও থামেনি—’ ইলিয়াস বাংলা কথাসাহিত্যের জীবনানন্দ। কবিতায় জীবনানন্দ দাশ যা ঘটিয়েছেন কথাসাহিত্যে ইলিয়াস ঘটিয়েছেন ঠিক সেটাই। বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময় জাগে—উদারমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, বিশ্বনাগরিক এই মহাপুরুষ বাংলাদেশেই জন্মেছিলেন!মহাপ্রস্থানদিবসে ‘শব্দেরা’ বাংলাভাষার বিরলতম কথাশিল্পীকে কুর্নিশ জানায়।