আবদুস সালাম সমু

আবদুস সালাম সমু

জন্ম : ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৮। হরিপুর। দক্ষিণ দিনাজপুর। পশ্চিমবঙ্গ। ভারত। শিক্ষাগত যোগ্যতা : পিএইচডি। সরকারি চাকরি।অধ্যাপক ও গেজেটেড অফিসার। বদলিসূত্রে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় মালদাতে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন, গণশক্তি, সানন্দা, দেশ, নন্দন, উত্তরবঙ্গ সংবাদ প্রভৃতি পত্রিকা ও দৈনিকে কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয়েছে। রামকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত এবং ফাউন্ডেশন অব সার্ক রাইটার্স অ্যান্ড লিটরচার (নতুন দিল্লি) এবং কিরণ প্রকাশন (কলকাতা) থেকে প্রকাশিত দুই বাংলার তরুণদের কবিতা 'পরবর্তী শব্দাবলী' (ডিসেম্বর ২০০২) গ্রন্থে দু'টি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। রামকুমার মুখোপাধ্যায় গ্রন্থের সম্পাদকীয়তে লিখেছেন : 'রবীন্দ্রনাথের জগতের সঙ্গে বর্তমানের সমাজ-রাষ্ট্রের পদে পদে অমিল। সেকথা যেমন বাংলাদেশের জহির হাসানের কবিতায় ফুটে ওঠে তেমনই পশ্চিমবঙ্গের জয়দেব বসুর পংক্তিতে। মারজুক রাসেল তাঁর 'মাল' কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের যে অমানবিক জীবনযাপনের কথা লেখেন তারই অন্য এক ছবি আবদুস সালাম সমুর 'কৃষক' কবিতায়।' প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: 'দু'হাজার এক' (১৯৯৩), মধ্যবর্তী নির্বাচন, বালুরঘাট, দক্ষিণ দিনাজপুর। 'সনির্বন্ধ মনস্তাপ' (২০০১), প্রতিভাস, কলকাতা।সম্পাদিত পত্রিকা: মধ্যবর্তী নির্বাচন, সংবর্ত ইত্যাদি। বাংলা ও ইংরেজিতে অনেকগুলি গবেষণাপত্র দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এখন আর কোথাও লেখা পাঠান না। ব্যতিক্রমী দু'একটি লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া সব রকমের লেখাই আজকাল ফেসবুকে প্রকাশিত হয়।

বাঁশিওয়ালা ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

লোকটা বাঁশি বাজায়। আর বাঁশি বাজালেই কী আশ্চর্য গলা চিরে রক্ত উঠে আসে। না বাজালে ওঠে না। তবু বাজায়। এই তার নিয়তি। তার বাঁচা। ভুল বললাম। বাঁশি নয়, আসলে সে জীবনকে বাজায়। বাজায় মৃত্যুকেও। বলে, “বাঁশি বাজাব না? বল কী ভাগনে? তাহলে বাঁচব কী করে?” কিন্তু জীবনের এই নিধি, জীবনমৃত্যু একাকার হয়ে যাওয়া এই মরমি শিল্পকেও একদিন বিদায় জানাতে হয়। হয়তো স্বেচ্ছায় নয়। অনেকটাই বাধ্য হয়ে। অভাবেও। আবার কখনো ভালোবাসার মানুষটিকে খুশি করার অমোঘ তাগিদে। অথবা মৃত্যুতে। তখন সেই রক্তখেকো বাঁশি বহির্ভুবন থেকে একেবারে অন্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আর সেখানেই অনবরত একটা রিনরিনে ব্যথার মতো বাজতে থাকে চিরকাল। এই নেশা, এই সুরসুধা একজনের কাছ থেকে অন্যজনের মধ্যে সঞ্চারিত ও সংক্রমিত হয় কালে কালে।
কবে পড়েছিলাম আজ আর মনে নেই। আর আট দশজন স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া বাঙালির মতো ‘পাশেফেল’ দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। তার অনেক আগেই মানিকের সঙ্গে আমার সত্যিকারের পরিচয় ঘটিয়ে দেয় ‘অতসীমামী’। তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে তাঁকে, তাঁর রচনাকে বুঝতে চেয়েছি। চিনতে চেষ্টা করেছি। মানিককে নিয়ে সম্পাদকীয় লিখতে বসে কিছুতেই তাঁকে আমি ‘অতসীমামী’র যতীনের থেকে পৃথক করে ভাবতে পারছি না। ফিরে পড়তে বসে আজও আমার স্মৃতিতে জমে থাকা সেই বাঁশি বাজানো মানুষটা ফুঁ দিয়ে চলেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর যতীন্দ্রনাথ রায় আজও আমার দৃষ্টিতে এক ও অবিচ্ছেদ্য দু’টি জ্যান্ত চরিত্র। আসলে মানিকের জীবনের সঙ্গে তাঁর শিল্পের এতটাই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যে আলাদা করে ভাবাই যায় না। অথচ অতসীমামী লেখা হয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে তর্কে বাজি জেতার জন্য : “এ গল্প সাহিত্য করার জন্য লিখিনি-লিখেছিলাম বিখ্যাত মাসিকে গল্প ছাপানো নিয়ে তর্ক জিতবার জন্য।”-তর্কে স্থিরিকৃত বাজি তো জিতেছিলেন। কিন্তু তারপর আত্মমর্যাদায় আসীন হয়ে জীবনব্যাপী সামাজিক দায়বদ্ধতার যে বাজি তিনি লড়ে গেছেন তার কত কিছুই আমরা জানি না বা জেনেও মুখ ফিরিয়ে থাকি। ২০ বছর বয়সে লেখা অতসীমামীকে মানিক নিজেই ‘রোমান্সে ঠাসা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই ‘অবাস্তব কাহিনি’র মধ্যেই মানিকের ভাবীকালের জীবন ও সাহিত্যের শেকড়টি যে প্রথিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মেধাবী ছাত্র। অঙ্কে অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়ছেন অথচ ঘর ভর্তি বিদেশি, বিশেষত রুশ সাহিত্যের বই! ফলে পরীক্ষা না দেওয়া এবং দেওয়া। এবং অনুত্তীর্ণ হওয়া। বলা যায় তথাকথিত প্রতিষ্ঠান তাঁকে গ্রহণ করতে পারেনি অথবা তিনি প্রতিষ্ঠানের যোগ্য হননি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বিদায় জানিয়ে মহত্তর বাজির জন্য তিনি ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিস্মিত পরিজন। দেশ থেকে দাদার চিঠি-আর টাকা আসবে না। দাদার ইচ্ছে-মানিক আগে পাঠ্যপুস্তক পড়ে পরীক্ষায় পাশ দিক তারপর যত খুশি সাহিত্য করুক। মানিক দাদাকে লিখেছিলেন, “গল্প উপন্যাস লেখা ও পড়া আমি ছাড়তে পারব না। কাজেই কলেজের পড়াই আমাকে ছাড়তে হবে। তবে আপনি দেখে নেবেন, কালে এই লেখার মাধ্যমেই আমি বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে স্থান করে নেব। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের সমপর্যায়ে আমারও নাম ঘোষিত হবে।” কী দৃঢ় এই আত্মবিশ্বাস!আত্মবিশ্বাস নাকি গোঁয়ার্তুমি? এই একগুঁয়েমি, সুনিপুণ বিজ্ঞানমনস্কতা আর ‘অন্তর্গত রক্তের ভেতরে’ গিয়ে ময়নাতদন্ত চালিয়ে বিশ্লেষণ করার চমকপ্রদ ক্ষমতা নিয়ে উপনিবেশের প্রসব করা উলঙ্গবাহার বাঙালি ‘ব্যক্তি’ চরিত্রকে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে ‘হোলবডি স্ক্যান’ করে পরিবেশন করতে শুরু করলেন। চরিত্রটি—”নিজের অনেক ভেতরে চোখ ফেলতে বাধ্য হয়ে সে দেখে তার মধ্যে কী শোচনীয়, কী ভয়াবহ রকমের ধস নেমেছে। প্যাথলজির রিপোর্ট হাতে নিয়ে ল্যাবরেটরির দরজায় সে দাঁড়িয়ে থাকে, চলার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে, তার নাদুসনুদুস গতরটা তাকে এতদিন কী প্রতারণাই না করে এসেছে। অণুবীক্ষণযন্ত্র তার যে রোগ শনাক্ত করেছে তার চিকিৎসা কেউ জানে না।” শশী ডাক্তার হয়েও নিজের রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা করতে অক্ষম। ফলে কুসুমও যে কখন অজান্তেই ঝরে শুকিয়ে গেছে সে বুঝতেই পারেনি। বাংলা কথাসাহিত্যে এই আকস্মিকতার আমদানি রবীন্দ্রশরৎ পরবর্তী পর্যায়ে মানিকের নিখুঁত ও নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ফসল। সূচনাপর্ব থেকেই জীবনকে খুঁটিয়ে দেখার এই প্রবণতা যা তাঁকে ব্যক্তিমানুষের ক্ষত বা ব্যক্তিনিয়তি আবিষ্কার করতে সাহায্য করল সেটি তাঁর জীবনব্যাপী ক্রিয়াশীল ছিল। ফলে এমন একটা সিদ্ধান্তে আসা মনে হয় অসঙ্গত নয় যে, সূচনাপর্বে মানিক ফ্রয়েডের পাশাপাশি অসচেতন মার্ক্সবাদের দ্বারা চালিত ছিলেন। পরবর্তীতে যা তাঁরই আবিষ্কৃত ব্যক্তিগত ক্ষতের প্রতিষেধকরূপে সচেতন মার্ক্সবাদে রূপান্তরিত হয়। এ প্রসঙ্গে গোপাল চরিত্রের কথা উল্লেখ করা যায়। ফলে মানিক সংক্রান্ত আলোচনায় পর্ববিভাজন ঘটিত যে বিষয়টি এতকাল ধরে এতবেশি মান্যতা পেয়েছে সেখানে আপাত বিরোধ থাকলেও প্রকৃত বিরোধ নেই এটা মেনে নেওয়া স্বাস্থ্যকর। তবে মার্ক্সবাদে আস্থা আমৃত্যু টিকে থাকলেও প্রতিবাদের স্বতঃস্ফূর্ততাকে চাপা দিয়ে সমকালীন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির বারফাট্টাই ও আনুষ্ঠানিকতাতে তাঁর কোনো আস্থা ছিল বলে মনে হয় না।
মানিক তাঁর সাহিত্যিক দায়বদ্ধতা তথা সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ সম্পর্কে বরাবর সচেতন ছিলেন। নিজের শরীর ও মনের উপর যারপরনাই অত্যাচার করেছেন। প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। প্রবল দারিদ্রের মধ্যে সপরিবারে অশেষ যন্ত্রণা সহ্য করেছেন।তাঁর দারিদ্রপীড়িত জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ছবিটি তুলে ধরতে গিয়ে কলম কেঁপে ওঠে। দম বন্ধ হয়ে আসে। অভাবের চূড়ান্ত চলছে সংসারে। সেই সময় তিনি বরানগরের ভাড়াবাড়িতে থাকেন। তাঁর স্ত্রী একটি মৃত সন্তান প্রসব করেন। মানিক লিখেছেন, “বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি অখুশি নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বলল যে, বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করেছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনি বিদায় দেব। অনেক খরচ বাঁচবে।” এই মর্মান্তিকতার দিনেও তিনি তাঁর অসাধারণ দায়িত্ববোধ থেকে সরে দাঁড়াননি। পয়সাওয়ালা ভাইদের উপরে নির্ভরশীল না থেকে বৃদ্ধ বাবাকে রেখেছেন নিজের কাছে। কমিউনিস্ট দল ছেড়ে বেরিয়ে না আসাটাও তাঁর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার আরও একটি বড় প্রমাণ। এই দায়বদ্ধতাই তাঁর সাহিত্যের প্রাণ। সেজন্য কোনো ভেজাল বা ফাঁকি তিনি তাঁর সাহিত্যে আমদানি করেননি। বরং উত্তরকালে বারেবারেই নিজের লেখার ফাঁকিগুলিকে শনাক্ত করেছেন নির্মোহ বস্তুবাদীর দৃষ্টিতে। ভাববাদ বা অধ্যাত্মবাদের মোহ থেকে তিনি নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত রেখেছেন আজীবন। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির দায়বদ্ধতার সবচেয়ে বড় নমুনা হতে পারে ‘কুমুদ ও মতি’ উপকাহিনিটি। “গৃহবিমুখ যাযাবর স্বামীর সঙ্গে মতিও আজ এলোমেলো পথের জীবনকে বরণ করিল-আমাদের গেঁয়ো মেয়ে মতি। হয়ত একদিন ওদের প্রেম নীড়ের আশ্রয় খুঁজিবে, হয়ত একদিন ওদের শিশুর প্রয়োজনে নীড় না বাঁধিয়া ওদের চলিবে না-জীবনযাপনের প্রচলিত নিয়মকানুন ওদের পক্ষেও অপরিহার্য হইয়া উঠিবে। আজ সে কথা কিছুই বলা যায় না। পুতুলনাচের ইতিকথায় সে কাহিনি প্রক্ষিপ্ত—ওদের কথা এইখানেই শেষ হইল। যদি বলিতে হয় ভিন্ন বই লিখিয়া বলিব।” কিন্তু পরে আর কখনই তিনি এই প্রয়োজন অনুভব করেননি। কেন করেননি? কারণ এই ধরনের বাউন্ডুলে চরিত্রদের তিনি সবে দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু পরিণতি সম্বন্ধে সন্দিহান। একটা আন্দাজ করতে পারছেন বটে কিন্তু আন্দাজের উপর ভর করে কাল্পনিক পরিণতির ধাপ্পাবাজিতে তাঁর কোনো সায় ছিল না। তিনি ঠকতে ও ঠকাতে চাননি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘এলিজি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ শীর্ষক শোকগাথায় মানিকের সামাজিক দায়বদ্ধতার অভিপ্রায় চমৎকার ফুটেছে—
“আমি যেন টের পাই
আমি যেন দেখে যেতে পারি
তোমাদের কঠিন অসুখে
তোমরা ঔষধপত্র পেয়েছিলে কিনা ঠিকঠাক
অনন্ত নক্ষত্র দূরে খেলা করে-করে হতবাক।”
দারুন ব্যথা পেলে আমরা প্রচলিত ছকে হাউমাউ করে কাঁদি। মানিক সুর বেঁধে গান ধরেন। ব্যথা বাড়লে সুরও বাড়ে। এই ব্যথা তো কেবল ব্যক্তির নয়, সমাজেরও, সুরও তাই উপশম হয়ে ওঠে। মানিক চেনা ছকে তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে বাঁধেননি। বাঁধেননি বলেই আমরা তাঁকে নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়ে যাই। আমরা বুঝে উঠতে পারি না বলে ছকের বাইরে এসে হাঁসফাঁস করি। তিনি প্রথমপর্বে ফ্রয়েড, পরের পর্বে মার্ক্স, তিনি মার্ক্সবাদ ছেড়ে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—ইত্যকার আলোচনায় পন্ডশ্রম করি। একটি আলোচনাচক্রে একজন বিশিষ্ট অধ্যাপককে মানিকের যে আসল নাম ‘প্রবোধ’, এই প্রবোধ দেওয়াতেই অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখে আর অবাক হই না। কারণ মধ্যবিত্ত ঘরে জন্মে, ফাঁকফোকর গলিয়ে মানিক তো সেই কবেই ছকভেঙে বেরিয়ে গেছেন। প্রত্যাখ্যান করেছেন যাবতীয় মধ্যবিত্ত ছকের ধাস্টামো। মানিক চাইলে লেখালেখি সমেত হয়ত কোনো বড় পুরস্কারসহ একটা ভদ্রস্থ মধ্যবিত্তের জীবন কাটিয়ে যেতে পারতেন। “কিন্তু কোনোদিকেই মাঝারি হওয়ার সৌভাগ্য নিয়ে তিনি আসেননি। চূড়া যেমন তাঁর মেঘলোক ছাড়ানো খাদও তেমন অতল গভীর। তাই মানিয়ে নেবার মানুষ তিনি নন।” যত ক্ষতিই হোক চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া তাঁর যে কিছুতেই চলে না। এমন একজন সৎ ও মহৎ শিল্পী মৃত্যুর ঠিক একমাস আগেও তাঁর শ্রেষ্ঠগল্পের বই বিক্রি করছেন নিজহাতে। দোকানমালিকের কাছে তাঁর সকরুণ আর্তি যেন পাঁচকপি বই নগদ পেমেন্টে রাখা হয়। কেননা তখন যে তাঁর বড়ই অভাব। মদ খাওয়ার পয়সাও জোটে না। মদ খাওয়া তিনি ছাড়তেও পারেন না। এই তাঁর নিয়তি। তাঁর বাঁচা।
প্রথম রচনার নিজস্ব সাহিত্যসৃষ্টির সেই রেখাভাস জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ক্রিয়াশীল ছিল। “কেবলই মনে হয়, নেশাকে মানুষ এতবড় দাম দেয় কেন। লাভ কী? এই যে যতীনমামা পলে পলে জীবন উৎসর্গ করে সুরের জাল বুনবার নেশায় মেতে যান, মানি তাতে আনন্দ আছে। যে সৃষ্টি করে তারও যে শোনে তারও।” কিন্তু প্রশ্ন জাগে যদি কেউ না শুনতে চায়, না শোনে তখনও কজন অমন করে বলতে পারে, “রক্ত পড়বে তো হয়েছে কী? তুমি শুনলেও আমি বাজাব, না শুনলেও আমি বাজাব।”…
তাই যতীন্দ্রনাথ রায় বাঁশি বজায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাঁশি বাজান। আর বাঁশি বাজালেই কী আশ্চর্য গলা চিরে রক্ত উঠে আসে। রক্ত তো রক্তই। কিন্তু তার ভেতর থেকে উঠে আসা জীবনের সুর, জীবনের নির্যাস—
তা কি অমৃত নয়?
“যে-বাঁশি বাজাও তুমি
তাকে আরো মূল্যবান করা
হবে কি আমার?
প্রিয় অর্ফিয়ুস, আমার স্তবেই হলো হার।”

[২০ মে, ২০০৮ ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’এ প্রকাশিত আমার ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও একজন বাঁশিওয়ালার গল্প’ নিবন্ধের সহযোগিতা গ্রহণ করেছি।]

আরো পড়ুনবাঁশিওয়ালা ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

মা

শ্রীহরি দত্তের ছবি

শ্রীহরি দত্তের ছবিমা তুমি শুকিয়ে এইটুকুনি হয়ে গেছ
তোমার হাতে গড়া এই মহেঞ্জোদরো
উঠোনের পাশে এই আমগাছ, মহানিম
তুমিই তো শেষ ছায়া ও আশ্রয়
মাটির উনুনশিল্প, কাঁথাকানি, দেওয়ালচিত্র
সবেতেই তুমি, ঘরময় স্নেহচিহ্ন অথচ
মৃত্যুর ইশারায় তোমার ভারতবর্ষ আজ
শূন্য হয়ে আছে

গরম ভাতের থালা বেড়ে দিতে দিতে
তুমি বলতে বড় হস বাপ
আমরা সবাই খুব বড় হয়েছি, এতটাই বড় যে
নাড়িছেঁড়া সুখ আর অকৃতজ্ঞ দূরত্বে
বিয়োগ চিহ্নের মতো উদাসীনতা স্পর্শ করেছি
‘সালাম সালাম’ বলে তুমি জেগে ওঠো দেশ
তোমার হেঁশেল ছাড়া কারো মুখে অন্ন রোচে না

ছবি: শ্রীহরি দত্ত

আরো পড়ুনমা

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস – মাত্র ২টি উপন্যাস—চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা।

মাত্র ২টি উপন্যাস—চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা। একটির সঙ্গে অন্যটির রচনা ও প্রকাশকালের ব্যবধান প্রায় ১০ বছর! ৫টি গল্পগ্রন্থ। উৎসব, যুগলবন্দি, খোঁয়ারি, দোজখের ওম, দুধভাতে উৎপাত, কান্না, রেইনকোট ইত্যাদি প্রকাশিত, অপ্রকাশিত, গ্রন্থিত, অগ্রন্থিত সবমিলিয়ে মোটে ৩১টি গল্প। মৃত্যুর পর প্রকাশিত ১টি প্রবন্ধের বই—সংস্কৃতির ভাঙা সেতু। ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা আরও কিছু সমাপ্ত অসমাপ্ত রচনা ও সাক্ষাৎকার—বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকারের এটুকুই সম্বল! হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন : ‘অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে একটা বিচিত্র, আচমকা, অচেনা সাহিত্য সৃষ্টি করে অকালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রস্থান করেছেন।’ তাঁর প্রস্থানের দিনটি আজও স্পষ্ট মনে আছে। রেডিও নিয়ে গ্রামের পুকুরপাড়ের দক্ষিণপূর্বকোণে বসে আছি। দিল্লি থেকে বাংলা সংবাদ। ‘খবর পড়ছি শঙ্কর মুখোপাধ্যায়।’ শঙ্কর মুখোপাধ্যায় কি? সম্ভবত। সেই খবরে আচমকা জানতে পারলাম, বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল, ইলিয়াস নেই! কথাকার অভিজিৎ সেন হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘চিলেকোঠার সেপাই’। এই বঙ্গে বইটি তখনও অপ্রকাশিত। পড়ে চমকে গিয়েছিলাম। ঢাকায় যাইনি কিন্তু ঢাকার প্রতিটি রাস্তা, আস্ত শহরটা, প্রায় গোটা বাংলাদেশ চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল। সেই শুরু, পরে তাঁর সব লেখা পড়েছি। ক্রমে ক্রমে বুঝেছি, মহাশ্বেতা দেবী যাঁকে বাংলাভাষার ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন সেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলাসাহিত্যে ক্রিটিক্যাল রিয়ালিজমের গুরু। কী অসামান্য দক্ষতায় তিনি ভাষাচাবুক প্রয়োগ করে মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। তথাকথিত অশ্লীল শব্দের উচ্চতম শ্লীল প্রয়োগ বাংলা সাহিত্যে এক নজিরবিহীন ঘটনা। হাসান আজিজুল হক মনে করেন : ‘বাংলা ভাষার যাবতীয় শব্দ পচিয়ে তৈরী হয়েছে একরকম রৌদ্র-পক্ক আরক। টলটলে স্ফটিকের মতো রঙ তার, ঝকঝকে ছুরির মতো ধার। কখনও মনে হতো এই ভাষা অতি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন খোলা বৈদ্যুতিক তার।’ অভ্যস্ত রুচি ও সংস্কারকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে ইলিয়াস মুহূর্তেই যেন পাঠকদেহ থেকে সমস্ত শোনিত শুষে নেন। বাংলা ধেনো শব্দের হিরেপ্ল্যাটিনাম ছড়িয়ে আছে তাঁর রচনার ছত্রে ছত্রে। ভাষার লৌহপিন্ডকে ইলিয়াস দুমড়ে মুচড়ে শান দিয়ে তাকে ইস্পাতে রূপান্তরিত করেছেন। এই ভাষানির্মাণ সোশ্যাল কনস্ট্রাকটিভিজমের এক চমৎকার উদাহরণ। পাঠকের অনভ্যস্ত কানে তিনি ছেঁকা দিয়েছেন। এসব শব্দ, শব্দজোড়, বাক্য, বাকাংশ্য ইলিয়াসের চরিত্রের কাছে প্রতিদিনের শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো সরল, সত্য ও স্বাভাবিক। পাঠক বিস্মিত। বিচলিত।অভিজিৎ সেন ঠিক ধরেছেন : ‘ ইলিয়াস তাঁর পাঠককে যেন তাড়াতে থাকেন। বারবার তাড়া খাওয়ার পর যে কজন টিকে থাকে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বা ‘খোয়াবনামা’ তাদের উপহার দেয় এক বোঝা অস্বস্তি এবং বেশ কিছু বিস্ময়।’ আসলে পাঠককে চোখ পাল্টানোর সাহিত্য উপহার দিয়েছেন ইলিয়াস। অভ্যাসের ‘খোঁয়ারি’ ভাঙতে চেয়েছেন। ভেঙেছেনও। ইলিয়াস বিশ্বাস করতেন,’দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন না ঘটলে নতুন প্রকরণ খোঁজা আর নতুন নতুন ফন্দি বার করার মধ্যে পার্থক্য থাকে না।’ মধ্যবিত্তের রুচি ও সাহিত্যবৃত্তকে ভাঙার জন্য তিনি অশালীন যৌনতা এবং অপ্রচলিত-অভদ্র শব্দের দাপুটে প্রয়োগকে হাতিয়ার করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন : ‘sex নিয়ে সাহিত্য করা risky। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা লেজে গোবরে হয়ে যায়। যৌনতাকে আমি কোনো সময়েই glorify করার চেষ্টা করিনি।…আমি sex -এর পেছনে living মানে class কে দেখতে চাই, society কে দেখতে চাই।’ তাঁর প্রায় সমস্ত রচনায় বিশেষত ‘উৎসব’ বা ‘যুগলবন্দি’ গল্পে এই সত্য ধরা আছে। গৌণচরিত্র ইলিয়াসের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনসব চরিত্রকে, চরিত্রের মিছিলকে তিনি তুলে এনেছেন ক্ষেত্রবিশেষে যাদের নামটিও জগৎ সংসার ভুলে গেছে! কিন্তু সমাজ জীবনের বিশ্লেষণে এদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। হাড্ডি খিজির, হুরমতুল্লা, আসগর, জুম্মন, কুলসুম এবং অবশ্যই ‘তমিজের বাপ’। বিশ্বসাহিত্যে তমিজের বাপের মতো চরিত্রের আর একটিও নজির আছে বলে মনে হয় না। অভিজিৎ সেনের মতে : ‘ ইলিয়াসের প্রধান চরিত্রেরা যেন উষর প্রান্তরে বজ্রদগ্ধ তালগাছ, নিঃসঙ্গ, সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ সম্ভবনাহীন।’ কিন্তু স্বপ্ন-সত্য-সম্ভবনা সমস্তই বেঁচে থাকে ফুলজান বা সখিনাদের মতো বাংলা সাহিত্যে কলকে না পাওয়া এতকালের অবহেলিত চরিত্রগুলির মধ্যেই : ‘ফুলজানের বেটির মাথার ভেতরে বিজ বিজ করে কী। তাহলে এর মাথার এই বিজ বিজ আওয়াজ থেকে কথার কুশি বেরুবে, সেটাকে শোলোকে গেঁথে তুলবে কি এই সখিনাই? ভাত খাওয়া ছাড়া ছুঁড়ি আর বোঝে কী। এ কি আর শোলোক গাঁথতে পারবে?… মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে লম্বা তালগাছের তলায় পুরনো উই ঢিবির সামনে খটখটে শক্ত মাটিতে পাজোড়া জোরে চেপে রেখে ঘাড়ের রগ টানটান করে মাথা যতটা পারে উঁচু করে চোখের নজর শানাতে শানাতে সখিনা তাকিয়ে থাকে কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে জখম চাঁদের নিচে জ্বলতে থাকা জোনাকির হেঁসেলের দিকে।’ ০৪। ০১। ১৯৯৭ ইলিয়াস প্রয়াত। ২৭। ০১।১৯৯৭ শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন : ‘ইলিয়াস আজ নেই। এই ‘নেই’-এর কোনও সান্ত্বনাও নেই। কিন্তু ওসমান আছে—ওসমানের মাথায় বাসাবাঁধা খিজির আছে—তমিজের বাপ আছে : তার মেঘ তাড়ানো এখনও থামেনি—’ ইলিয়াস বাংলা কথাসাহিত্যের জীবনানন্দ। কবিতায় জীবনানন্দ দাশ যা ঘটিয়েছেন কথাসাহিত্যে ইলিয়াস ঘটিয়েছেন ঠিক সেটাই। বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময় জাগে—উদারমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, বিশ্বনাগরিক এই মহাপুরুষ বাংলাদেশেই জন্মেছিলেন!মহাপ্রস্থানদিবসে ‘শব্দেরা’ বাংলাভাষার বিরলতম কথাশিল্পীকে কুর্নিশ জানায়।

আরো পড়ুনআখতারুজ্জামান ইলিয়াস – মাত্র ২টি উপন্যাস—চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা।

আবদুস সালাম সমুর কবিতাগুচ্ছ

অদ্রীশ সিংহের ছবি
বহিরাগত

চিত্রদীপ দাশের ছবি

আমি যে শহরে থাকি
ফেলে আসা গ্রামের সেখানে কোনো চিহ্ন নাই
জনবিচ্ছিন্ন তামাম অ্যাপার্টমেন্টে আমি খুঁজি
খড়ের চাউনি, ছইঞ্চা
শহরের আলপথে অনেকটা হেঁটে গিয়ে
খুঁজে ফিরি চট পেতে অ-আ ভোরের শিউলি
অচেনা মিছিলে সবগুলো মুখই যেন
শ্রাবণমেঘের মতো চেনা—স্বপ্নময়
মনে হয় একটা বটগাছ পেলে চড়ে বসা যেত
দেখা যেত পাতার সড়ক গলে
ঝিকিমিকি রোদেদের ইছামতি
বটের ঝুরিতে মুখোমুখি দোলনার নাগরিক কার্নিভাল
গ্রীষ্মের দীর্ঘতম দিনে
পুকুরের পাশে বসার টঙ খুঁজি পার্কের বেঞ্চিতে
বাতাস খুঁজে ফিরি খিদের বাজারে, ভিস্তায়
কুব-কুব-কুব-কুব পাখির ডাক খুঁজি
সংবিধানে, ছাদের মালঞ্চে
স্পর্শের মতো ফকফকা জ্যোৎস্না খুঁজি হলুদ আলোয়
সাইরেনে খুঁজে ফিরি বাঁকরত রঙিন মোরগ
আকাশ ধরব বলে চুপিচুপি হেঁটে যাই আকণ্ঠ শৈশবে
আকাশ এখনও ঝুঁকে আছে ঐখানে যমুনাদির ঘরে
হারানো বকুল খুঁজি পিৎজায়, সেঙ্গোলে
ফ্লিপকার্টে খুঁজে মরি ব্যালকনি, বাপুজিনগর
ধুলোয় শিশির খুঁজি পাথরে সংহিতা
বুটের ভেতরে খুঁজি শ্রাবণকৃষকের মুঠি
শব্দে নৈশব্দ খুঁজি—চতুর্দিকে জেনোফোবিক
অসহিষ্ণু কসাই
খুঁজে পাওয়া যায় না কিছুই
শহরে সবই হারায়, সবাই হারায়
স্পর্ধার মতো লালনিশান খুঁজি তবু
বাণিজ্যিক উপত্যকায়

ছবি: চিত্রদীপ দাশ

দখল

অদ্রীশ সিংহের ছবি

যে আয়না ফুটিয়ে তুলত
তোমার ভুবন
যে নদীতে শিখেছিলে সাঁতার
যে সমুদ্রে অবগাহন
যে হৃদয়ে খড়কুটো দিয়ে
বুনেছিলে পাতার সংসার
যে মাঠে গন্ধছড়িয়ে খেলা করত
বেগুনবিচি ধান
কার হাতে সেসব এখন
কার হাতে তোমার বাগান
গাছগুলো কাকে দেয় ফল
জামবনে সাঁঝের জোনাকি
পেকে ওঠা জমির ফসল
জ্যোৎস্নার মতো বরফ ভেজানো
পদ্মার দিঘল ইলিশ
থোকা থোকা স্বপ্নগুলি
বেবাক দখল—শান্তগহীন জল
খেলা করে আজনবি ছায়া

ছবি: অদ্রীশ সিংহ

মেঘ

চিত্রদীপ দাশের ছবি

হামেশাই বলতেন : ‘কী হালে যে মৃত্যু হবে’
বাতাসে উড়ত ছাই
হিজাব বা বোরখা কিছুই পরতেন না
আম্মার খোলা চুলে খেলা করতো চৈত্রমাস

আব্বা বলতেন : ‘দোয়া করিস
যেদিকে তাকাই
মাঠভরা চকচক…চকচক…
কেবল চকচকে শ্রাবণ দেখার জন্য
আরও কিছুদিন থেকে যেতে চাই’
ধবধবে সাদা সাজে
আব্বাকে দেখাতো ফেরেশতার মতো

তুমুল ঝড়ে মাটি আলগা হয়
কা কা শব্দে মৃত্যু ওড়ে
কাকপাখির মতো দীর্ঘশ্বাস
চেপে বসে অবলুপ্ত খানকাঘরে

জলের অক্ষরগুলি জমির উপরে ফোটে
বৃষ্টি হয়, বৃষ্টির ভেতরে
শত শত গর্ভবতী মেঘ ঝরে পড়ে

ছবি: চিত্রদীপ দাশ

ঘোড়া

অদ্রীশ সিংহের ছবি

আপনি আমার কেউ নন বাংলাদেশ
হে মহাভারত তুমিও আমার কেউ নও
সাঁইজি তু্ই মেঘ না মরুভূমি
জানা নেই তাই
তু্ইও আমার কেউ হতে পারলি নে

শুনুন মশাই
আমার ঘোড়াই সব থেকে তেজি
আমি স্বধর্ম করি তবে
অন্যের ঘরে আগুন না দিয়ে মজা পাই না

গাছ ফুল পশু পাখি চন্দ্র সূর্য…
কয়লাখাদান বালিয়াড়ি সাদাকাপড়…
গেরুয়াবসন গণভবন…
নদী সমুদ্র সিংহাসন…
চাকরিবাকরি হিংসা ক্রোধ লোভ…
অলি গলি গীতাঞ্জলি…
গোলাবারুদ ঢেঁকি কেউ স্বর্গে যাবে না

আমি ও আমার ঘোড়া অবশ্যই স্বর্গে যাবো

ছবি: অদ্রীশ সিংহ

গন্ধ

চিত্রদীপ দাশের ছবি

কেউ যদি না বোঝে ?
না বুঝুক
একদিন কেউ না কেউ বুঝবে এই আশায়
ঝিনুকের ঘরে আগুনরাঙা স্বপ্নগুলো
রেখে যেতে হবে

শোকের মতো
দীর্ঘতম কোনো রজনীগন্ধা নেই

কী যে বলো যা তা !
কেউ যদি না খোঁজে ?
না খুঁজুক
গন্ধে গন্ধে তবু এই মহাগ্রহে
একদিন কেউ উপশমগুলি খুঁজে পাবে
এই সংকেতে
কমলালেবুর মতো অ্যালিগরি
জমা হতে থাকে উভচর অযোধ্যানগরে

ভালোবাসার মতো
দীর্ঘতম কোনো রাজনীতি নেই

ছবি: চিত্রদীপ দাশ

টব

অদ্রীশ সিংহের ছবি

একমাত্র সমুদ্র—ছেড়ে গেছে সেও
একমাত্র নদী সেও গেছে মায়ের সঙ্গে
আমি একা ফ্ল্যাটবন্দি, ঘেয়ো
আমি গেলে গাছে পানি দেবে কে ?

আমার কোনো জন্মে কেউ ছিল নাকো
আমার বাঁচামরায় শতজন্মের কালো
সম্পর্কের শেষে দেখি ভাঙা এক সাঁকো
হঠাৎ বাঘের মতো সামনে দাঁড়ালো
যা—পাখি হ…স্—যা—পাখি হু…স্—
অলিন্দে জলের বাটি পড়ে আছে অপেক্ষায়
জল-ক্ষেতে আসে না মৌটুস

মাঝে মাঝে ফোন করে জলশূন্য ঢেউ :
—আমি বেঁচে আছি কি না ?
—প্রেসারের ওষুধ খেয়েছি কি না ? স্নান ?
শেকড়গুলি নিজেদেরই পেঁচিয়ে ধরেছে

মৃত্যুগন্ধে ভরে আছে টবের বাগান

ছবি: অদ্রীশ সিংহ

আরো পড়ুনআবদুস সালাম সমুর কবিতাগুচ্ছ

আপনি কি সত্যিই একদা এ বঙ্গদেশে জন্মেছিলেন!

উর্বি ইসলামের ছবি

উর্বি ইসলামের ছবি

এঁড়ে বাছুর জন্মেছে !‘…
‘The man to whom I have applied has the genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an Englishman and the heart of a Bengali mother’—
মায়েদের, মেয়েদের নেতৃত্বে অন্ধকার তাড়ানোর গণআন্দোলনে দিগন্ত তোলপাড়। সুরক্ষা ও অধিকার চেয়ে মেয়েরা রাতের স্বাভাবিক ও ‘সিম্বলিক’ দখল খুঁজছেন। খুঁজবেন। বিদ্যাসাগর বাস্তবিক খুঁজেছিলেন। বিশ্বাস করতেন নারীদের ‘নিজস্ব কক্ষ’ চাই। চাই-ই।…
যে জিনিসটা আজ বাঙালি হারাতে চলেছেন অথবা হারিয়েই ফেলেছেন সেটাই ছিল বিদ্যাসাগরের চালিকাশক্তি। জেদ>সংকল্প>মেরুদণ্ড।
নির্বিচারে কিছুই মেনে নেননি। ভগবানে বিশ্বাস করতেন না কিন্তু মা-বাবাকে ভগবানের মতো ভক্তিশ্রদ্ধা করতেন। এগিয়ে ছিলেন তাই একা ছিলেন। এগিয়ে ছিলেন তাই সময়ের হাজারো কটূক্তি, অসম্মান সহ্য করেছেন। মানুষের কল্যাণই ছিল কর্মমন্ত্র। গদ্যভাষা, নতুন চিন্তাচেতনা, প্রশ্ন ও প্রতিপ্রশ্ন, শিক্ষা ও সংস্কার সর্বার্থেই বাংলা ও বাঙালির ‘জনক’ ছিলেন। চমকে ফিরে ফিরে তাকাই। নাতিকে নিয়ে পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের ‘এঁড়ে’ মস্করা। মহাকবির মহাবিশ্লেষণ ও বিশেষণ। ‘বীরাঙ্গনা’ উৎসর্গের জন্য সঠিক ‘ব্যক্তিত্ব’ নির্বাচন। এখন চারিদিকে ব্যক্তিদুর্ভিক্ষ। পচা মানুষের ভিড়। ব্যক্তিত্বের বড়ই অভাব।
হ্যাঁ সাগর মশাই, এঁড়ে বাছুরের এক অত্যাশ্চর্য জীবনপথ আপনার। সেই পথের যাত্রাক্ষত, সংগ্রাম ও সৌন্দর্য আপনাকে অসীমালোকের মর্যাদা দিয়েছে। আপনার জীবন এক অনমনীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত। সমকাল আপনাকে স্বীকৃতি দেয়নি। বলা ভালো স্বীকৃতি দিতে গড়িমসি করেছে।
‘শব্দেরা’ নতজানু আজ। শব্দেরা চায়, শব্দেরার একান্ত দাবি, আপনার জন্মদিন ২৬ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষক দিবসে’র মর্যাদা পাক। কূপমণ্ডূক বাঙালিকে চাবুক মেরে চনমনে করার জন্য, বিচলিত এবং শায়েস্তা করার জন্য আপনাকে আজও সমান প্রয়োজন।
হে নাস্তিক হে ঈশ্বর হে পথিকৃৎ হে শিক্ষক হে সৈনিক আপনাকে অবিনশ্বর প্রণাম।…
সমকালের কত ‘ঋষি ও মনীষী’ আপনাকে পণ্ডিত না ভেবে মূর্খ ভেবেছেন! বঙ্কিম কটাক্ষ ছুড়েছেন। বোঝেননি। চিনতে পারেননি! এখনো বা ক’জন চেনেন বা বোঝেন সন্দেহ হয়। রবীন্দ্রনাথ সঠিক বলেছেন আপনি ‘এই বঙ্গদেশে একক’ ছিলেন। হ্যাঁ আপনি আজও ‘একক’! বন্ধুর জীবনপথে আপনার একমাত্র বন্ধু ছিল নৈতিকতা। সেখানে কোনো আপোশ ছিল না।
হে প্রগাঢ় পিতামহ’ আপনি কি সত্যিই একদা এ বঙ্গদেশে জন্মেছিলেন!

ছবি: উর্বি ইসলাম

আরো পড়ুনআপনি কি সত্যিই একদা এ বঙ্গদেশে জন্মেছিলেন!

পৃথিবীর সহজতম কবিতা

উর্বি ইসলামের ছবি

ঘরে ফেরার কোনো তাড়া নেই
কার জন্য তাড়া ?
দরজা খোলার জন্য
কেউ তো অপেক্ষায় নেই
কত মানুষের ঘরই নেই
রাজহোটেলে ভাত খেয়ে
অনিচ্ছায় ঘরে ফিরব
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা
আমারই মতো
একজন মানুষকে দেখে হাসি পাবে
অশ্রুও পাবে দু’এক ফোঁটা…

উর্বি ইসলামের ছবি

ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে
শুয়ে পড়ব
বিছানায় পাশ ফিরব ১০৮ বার
তারপর ঘুমিয়ে পড়ব একা একা
ফোঁটা ফোঁটা লালচিহ্নে
ফুটে উঠবে অশোকগুচ্ছ
অ্যাডেনিয়াম
পৃথিবীর সমস্ত অভিমান
দরজা থেকে ফিরে যাবে

ছবি : উর্বি ইসলাম

আরো পড়ুনপৃথিবীর সহজতম কবিতা

শব্দেরা পুনর্বার আমাদের জড়িয়ে ধরেছে

আমাদের মধ্যে অনেকেই একটা সময় ছাপাপত্রিকা সম্পাদনা করেছি। কমবেশি কিছু অভিজ্ঞতা আছে। এখন সময় অবশ্য পাল্টে গেছে। ম্যাগাজিনের পাশে জায়গা পেয়েছে ওয়েবজিন। ঢেউ আছড়ে পড়েছে বিশ্বময়। গ্লোবালাইজেশন, লোকালাইজেশন ইত্যাদিরা হাত ধরাধরি করে চলেছে। এক পা গ্লোবে তো আরেকটা জঙ্গলমহলে। গৌতম মালাকার, তনুশ্রী ভট্টাচার্য  আমেরিকায় তো নিখিলেশ রায় কোচবিহারে। দূরত্ব, দূরত্বহীনতা। কোভিডপরবর্তী সময় ও পৃথিবী সম্ভব করে তুলেছে আরও একবার পাশাপাশি এসে একটা ডিজিটাল ম্যাগাজিন প্রসব করার।

পেন্নাম হ‌ই কবিগুরু, মারাংবুরু :

কাল ছিল ডাল খালি, আজ ফুলে     যায় ভরে।
বল্ দেখি তুই মালী, হয় সে কেমন করে।‘…শৈশবের সেই বিস্ময় আজও আমাদের ঘোরের মধ্যে রেখেছে। বয়স বেড়েছে কিন্তু ঘোর এতটুকুও কমেনি বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল—’অমল ও দইওআলা।’ দইওআলা খুব টানতো। অমলের জন্য কান্না পেত খুব। মন কেমন কেমন করতো। বেচারা কোথাও যেতে পায় না। কী একটা অসুখ! এখন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও দেখছি দইওআলার জন্য সেই আগের মতোই সমান টান আর অমলের জন্য সেই এক মনখারাপ। একই লেখা কোন যাদুতে এভাবে শৈশব, কৈশোর, যৌবন আর প্রৌঢ়ত্বকে একই সরণিতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়! আসলে মনের নৈকট্যের কাছে বয়সের ব্যবধান বড় নয় কখনো। অমলের বন্দিদশার আলাদা কোনো মানে আছে যা ‘মানেবই’এ নেই। সেজন্য প্রৌঢ়ত্ব, যৌবন, কৈশোর, শৈশব সব একাকার হয়ে যায় অনুভূতির আঙিনায়। ‘ফাল্গুনী’র চন্দ্রহাসের সংলাপকে সামান্য বদলে নিয়ে তাই এ কথা বলাই যায় রবীন্দ্রনাথ ‘বারে বারেই নতুন (প্রথম) ফিরে ফিরেই নতুন (প্রথম)।’ আসলে রবীন্দ্রনাথ এক পূর্ণাঙ্গ জীবনপরিক্রমা। পত্রিকার প্রথম প্রকাশের সঙ্গে এই বিস্ময়মানব জুড়ে থাকুন সেজন্য ২৫ বৈশাখ বা ২২ শ্রাবণ ‘শব্দেরা’ মুক্তি পাক—প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক গৌতম সেটাই বার বার আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন। আজ ২২ শ্রাবণ। পত্রিকার শব্দযাত্রা।

হ্যাঁ, রুটিরুজির প্রশ্নে আমরা ছড়িয়ে রয়েছি। ‘শব্দেরা’ পুনর্বার আমাদের জড়িয়ে ধরেছে। যে যেখানে থাকুন এগিয়ে আসুন। পরস্পরকে স্পর্শ করুন। লিখুন। নতুনের পাশে ফিরে আসুন পুরোনো বন্ধুরা। আসুন স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নে ভাস্কর চক্রবর্তী সহসা বলে গেলেন :

ছিলাম খেলায়
মগ্ন , ওগো
সহসা শুনেছি আজ
নদীর ওপার থেকে
ঘুমের ওপার থেকে —
লেখো লেখো ,
ইডিয়ট , লেখো ।’

আরো পড়ুনশব্দেরা পুনর্বার আমাদের জড়িয়ে ধরেছে