লোপামুদ্রা ব্যানার্জি

লোপামুদ্রা ব্যানার্জি

টেক্সাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রনিবাসী একজন লেখিকা, কবি, অনুবাদক, তার ৯ টি মৌলিক বই (কবিতা ও গল্প  সংকলন, স্মৃতিকথা ও উপন্যাস) ইংরিজি ডায়াস্পরা সাহিত্যের আঙ্গিনায় সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তাঁর  সম্পাদিত ৭-টি আন্থলজী (বিবিধ লেখক-লেখিকাদের সাহিত্য সংকলন) ভারতবর্ষ ও তার বাইরেও জনপ্রিয়তা ও সাহিত্য মহলে সম্মান অর্জন করেছে।‘Bakul Katha: Tale of the Emancipated Woman’, আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস ‘বকুল কথা’-র ইংরিজি অনুবাদের জন্য সম্মান পেয়েছেন London Book Festival-এ (২০২২)।‘কলকাতা ককটেল’ নামক একটি ছোট দৈর্ঘের ছবিতে তিনি অংশগ্রহন করেন। বর্তমান-এ তিনি টেক্সাসে শিক্ষকতা করেন, এবং সম্পাদনার সাথেও যুক্ত আছেন। সম্প্রতি মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘কবির বৌঠান’ উপন্যাস-এর ইংরিজি অনুবাদ ‘The Bard and His Sister-in-Law’ এর জন্য পত্র-পত্রিকায় প্রশংসা লাভ করেছেন।

সীতার জবানবন্দি—বা খোলা চিঠি (একটি মোনোলগ)

অঞ্জন চক্রবর্তীর ছবি

[মহাকাব্য ‘রামায়ণ’এর ট্র্যাজিক মহানায়িকা সীতার জবানিতে একটি কাল্পনিক চিঠি বা একটি দীর্ঘ মোনোলগ, তার পুত্রবধূ দের উদ্দেশ্য করে রচিত।
সময়কালঃ সীতার পাতাল প্রবেশের বহুকাল পরে।]

পৃথিবী জননীর গোপন গর্ভগৃহ হতে জেগে উঠেছি, এই আমি, বৈদেহী।
চোখের ঘন কালো কাজলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল বিন্দু বিন্দু অশ্রু—
চকিতে, নীরবে, সন্তর্পণে তারা আমায় টেনে নিয়ে যায়
আর কোন সর্বনাশা জীবন নাটিকার দিকে—ভয়, প্রবল ভয় পেয়ে বসে!
এ কোন নতুন মহাকাব্যের জাগরণ,
নাকি সেই সব অতীত স্মৃতি-ইতিহাস-দৃশ‍্যকল্পের মধ্যে নিমজ্জমান আমি,
যার সাথে প্রতি নিয়ত লড়ছি আজও?
সেই ছায়ান্ধকার জগতের প্রতিবিম্ব, যাকে তোমরা পুরাণের গৌরব দান করেছো?
তোমরা—আমার দুই স্নেহের পুত্রবধূ, আমার যমজ পুত্র
লব কুশের সাথে আজ আবদ্ধ হবে বিবাহবন্ধনে।

দুটি পুত্র যেন আমার হৃদয়ের অমূল্য দুটি টুকরো
তাদের স্নান করিয়েছি আমার অপাপবিদ্ধ যন্ত্রণার জলে
পান করিয়েছি মাতৃদুগ্ধ শোণিতের প্রবাহের সাথে
তারা দিনের পর দিন কঠিন পাথরের শয‍্যায় নিদ্রিত হয়েছে,
ঋষি বাল্মিকীর আশ্রমে আশ্রমবালক।
কান পেতে শোনো, ওই শোনা যায়—আমার নির্বাসনের বুক চেরা আর্তনাদ।
আর তোমরাও বুঝি বিবাহের মঙ্গলসূত্রে বাঁধা পড়ছো আর এক দয়াহীন,
ক্ষমাহীন, গৌরবময় মহাকাব্যের গানে?

অঞ্জন চক্রবর্তী ছবিআজও যেন অযোধ্যার পূণ‍্যভূমির শিকড়ে, আমার সতীত্বের পরীক্ষার গনগনে আগুন
পোড়া অঙ্গার হয়ে ঝলসে ওঠে বাঁধনহীন, শাসনহীন হাসিতে।
বীরপুঙ্গব রাজার বীর-রস, স্ত্রী-নির্বাসনের আদর্শ গাথা
হিমবাহের শীতলতায় বিরাজমান, হৃদয় গলে না, অবিচলিত তাঁর।
রাবন-রাজের দুর্বিনীত দশটি মাথা পুড়তে থাকে দশেরার পুণ্য উৎসবে
মহাসমারোহের সাথে—পতিত রাজা সে, যে আমায় একদা হরণ করেছিল
পরাক্রমী পৌরুষের অহংকারে, আর তার অহংকার ছিন্নভিন্ন করেছিলেন
আমার-ই বীরযোদ্ধা স্বামী, মহাকাব্যের অমোঘ এক যুদ্ধে।
আর আজ—কালের চক্রের অমোঘ আবর্তনে সেই একই রাজবংশে
তোমাদের অভিষেক হবে বধূবেশে, নীরব বশ্যতায় করবে মাল‍্যদান
অঙ্গীকারবদ্ধ হবে—নিজ সত্তায় শুষে নেবে সব কটি স্ত্রী-আচার, বিবাহের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে।
নিশ্চুপ এক শান্ত কোনে মুখ লুকাই আমি—অর্বাচীনের মতো
বিশালাকায় প্রাসাদের কোন এক প্রাচীন, পরিত্যক্ত প্রান্তে।
পৃথিবী মায়ের আবরণ ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে— দীর্ঘ দিন মৃত আমার এই হিমশীতল মুখ, শরীরী অবয়ব।
বেরিয়ে এসেছি সেই মাতৃগর্ভের আচ্ছাদন থেকে, যা এতদিন ছিল
আমার কাঙ্ক্ষিত স্বেচ্ছা- নির্বাসন, আমার পৃথিবী মায়ের না-ছেঁড়া নাড়ি।
সেই নাড়ির টানেই দৃষ্টির অগোচরে সরেছিলাম, সরেছিলাম প্রবল ঘৃণা, যন্ত্রণার ভারে।

মহাকাব্য আমার ভাগ্যনিয়ন্তা—জানি, আর এও জানি
তার শুরু থেকে শেষে, আমি এক নারীর চেয়েও অনেক বেশি
ছিলাম গুটি, দাবার বড়ে।
শূন্য থেকে শূন্যে ভেসেছে সীতার কুসুম-সুরভিত বিবাহের উপাখ্যান,
রুপকথাময় আনুগত্য, সীতাহরণ, নির্বাসন, সীতার মাতৃত্বের গরিমা, সীতার সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা—
নির্মাণ করেছ, বিনির্মাণ করেছ বহু বার।
প্রিয়তম রাজা রাম, আমার রাজাধিরাজ, আর তাঁরই সভাসদরা
তাঁর চতুর্পাশে মৌমাছির মত ভিন ভিন করা অনুচর-রা
আমার সতীত্বের ফুল-এর সত্যতা, কুঁড়িতেই বিনষ্ট করেছেন।
আহ! জানো না, এখনো কি জানো না?
‘সতীত্ব’-ই সেই একটি শব্দ, আজ যা এক বাসি, দগদগে ঘা-এর স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে—
সেদিন, অগ্নিপরীক্ষার সেই জ্বলন্ত দিনে, ভীষণ কোলাহলের মাঝে
যার অসহ তাপ বোঝে নি কেউ-ই।

আর আজ, এতকাল পরে, তোমাদের দুটি উদ্ভিন্ন যৌবনা শরীরের,
তোমাদের কুমারী, স্বপ্নালু চোখের অগোচরে দাঁড়িয়ে আমি,
একাকী, আনমনা হয়ে দেখি, বিবাহের আগুনে দাউ দাউ জ্বলছে চিতা!
সতীত্বের সেই ভীষণ অঙ্গীকারের রক্ত-মাংস পুড়ছে, পুড়ছে আনুগত্যের দৃপ্ত শিখা
নাছোড়বান্দা আনুগত্য, অপ্রাসঙ্গিকও বটে!
পাথর-চোখে চেয়ে দেখি তোমাদের সিঁথিতে সিঁদুরের বর্ষণ উৎসব—
চেয়ে দেখি—দ্বার খুলল বুঝি আর এক প্রবঞ্চনাময় মহাকাব্যের।

সহস্র-লক্ষবার শিখেছি, ভুলেছি, আমার নারীত্বের পরিভাষা,
সহস্র-লক্ষবার ভুলেছি সতীত্বের নষ্ট সত্যের অন্বেষণ।
লব-কুশ আমার আত্মজ, কিন্তু তারাও আমার রাজাধিরাজ রামের আদলেই সৃষ্ট—
তারা যে আজ প্রস্তুত, জন্ম নেবে আর একটি অগ্নি-স্নাত উপাখ্যান, ত্যাগ, তিতিক্ষা আর সহিষ্ণুতার।
প্রতারণা ও দীর্ঘ অপমানের পরে, বহু কষ্টার্জিত আর একটি অধ্যায়ের সূচনা।
কিন্তু তার আগে—একটি বার, শুধু একটি বার, হে কন্যারত্নরা, আমার আত্মজা নও জানি
তবু একটি বার হেঁটে দেখ আমার কণ্টকাকীর্ণ পথে, নিশ্বাস নাও একটি বার এই তপ্ত অঙ্গারে।
আর তারপর—নিমজ্জিত হবেই সেই পূতিগন্ধময় আখ্যানে।

ছবি: অঞ্জন চক্রবর্তী

আরো পড়ুনসীতার জবানবন্দি—বা খোলা চিঠি (একটি মোনোলগ)

দুটি কবিতা

সুজন মল্লিকের ছবি
ভালবাসা এসে দাঁড়ায়

সুজন মল্লিকের ছবি

আমার ভালবাসার সন্ধান
যেন কোন এক হারিয়ে যাওয়া চাহিদার ভাষা—
সীমিত জোগানের মাঝে যে ভাষা ধুঁকতে থাকা, মৃতপ্রায়।

কিন্তু তবু, কিছু কিছু অমুল্য ক্ষণের জন্য, কিছু কিছু স্থানে
ভালবাসা এসে দাঁড়ায়—
হঠাৎ জ্বলে ওঠা, ক্ষুধার্ত আগুনের আঁচে,
প্রিয় মানুষের অস্থিতে, পোড়া ছাই-এর গন্ধে।

চকিতে রোদ্দুরের তাপ লাগা কোন এক চোরাগোপ্তা ডেরায়
অন্ধকার, অনাবশ্যক কোনে-খাঁজে
স্বপ্ন-শিশুরা ভেসে বেড়ায়—আমি দুচোখ খুলি, বন্ধ করি, দেখে ফেলি অতর্কিতে।

কিন্তু তবু, কিছু কিছু অমুল্য ক্ষণের জন্য, কিছু কিছু স্থানে
ভালবাসা এসে দাঁড়ায়—
নিস্তব্ধ, কথা না হওয়া কার-রাইডে, উস্কানি-প্ররোচনা-নিয়ম লঙ্ঘনের ছদ্মবেশে।

এখনো কি জানো না আমার এক একটি নিভৃত রাতের কাহন?
এক একটি মুহূর্তের গিলে খাওয়া নিঃশব্দতা?
তালাবন্ধ ঘরের নেপথ্যে যখন আমাদের শব্দেরা খান খান হয়ে ভাঙে, রক্তাক্ত হয়?

কিন্তু তবু, কিছু কিছু অমুল্য ক্ষণের জন্য, কিছু কিছু স্থানে
ভালবাসা এসে দাঁড়ায়—
আমাদের-ই প্রাত্যহিকের পৃথিবীর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়,
যখন আমি ঘুরে-ফিরে বেড়াই, অযথা বেমানান।

যুগের পর যুগ—তুমি আমি ঘুরে মরেছি স্মৃতির বাতাসে
পরিচিত শহরের, পরিচিত আকাশের ঘ্রান নিয়ে, আজন্মের ভিটের শিকড়ে।
মরিয়া হয়ে খুঁজেছি হৃদয়ের নোঙ্গর বাঁধা কোথায়—
কোন গভীরে প্রোথিত ক্ষতচিনহের ইতিহাস।

কিন্তু তবু, কিছু কিছু অমুল্য ক্ষণের জন্য, কিছু কিছু স্থানে
ভালবাসা এসে দাঁড়ায়—
তুমি এসে আমার পাপগুলি স্পর্শ করো,
আর আমাদের অন্ধকার যুগল শরীরে মুক্তির আগল খুলে যায়।

ছবি: সুজন মল্লিক

অনুবাদ কবিতা
আমি কোনো ছবি আঁকবো নাএমিলি ডিকিন্সন
[মুল ইংরিজি কবিতাআই উড নট পেইন্ট—আ পিকচার—’]

না, আমি কোনো ছবি আঁকবো না—
বরং—আমি একটি ছবি হয়ে উঠবো
তার উজ্জ্বল, অসম্ভব উপস্থিতি, যার রেশ থেকে যায়, সুস্বাদু
সেই আঙুলগুলির মাঝে, ওরা অপার বিস্ময়ে অনুভব করে
স্বর্গীয়—বিরল—তাদের নাড়াচাড়া,
কত স্নিগ্ধ, মিষ্টি যন্ত্রণার আভাস জাগিয়ে দিয়ে যায়—
কি ভীষণ রাজকীয় সে নিরাশা, সে যন্ত্রণা।

সুজন মল্লিকের ছবি

না, আমি কোনো কথা বলব না—সেই মিষ্টি বাঁশির মত
বরং, সেই বাঁশিটিই হয়ে উঠবো
যে বাঁশি সিলিঙয়ের পানে উত্থিত হয়ে থাকে– কোমল সুরে,
আর তার পরে—অনায়াসে, গ্রামগুলির ইথার তরঙ্গে ভেসে যায়।
কল্পনার বেলুনে ভাসমান আমি—কিন্তু ধাতব ঠোঁট
আমার পনটুন নৌকার জেটি।

না, আমি কবি-ও হতে চাই না।
বরং এই তো শ্রেষ্ঠ আরও—কানের অধিকার নিয়ে
প্রেমমুগ্ধ, আনন্দিত, অক্ষম–
অনুমতি আছে পূজা করার, শ্রদ্ধা করার
তবে সেই বিশেষ অধিকার বড়ই ভয়ানক।
আমার মধ্যে যদি সেই শিল্প ক্ষমতা থাকতো
নিজেকেই আশ্চর্য করার, সঙ্গীতের বজ্রনির্ঘোষে—
শিল্পী কি করত তবে?

ছবি: সুজন মল্লিক

আরো পড়ুনদুটি কবিতা

স্থানান্তরিত: একটি যাপনের কবিতা

শুভাঙ্গী মুখার্জীর ছবি

শুরু করা যাক আমার পূর্বজদের কাহিনী দিয়ে।
আমার পিতামহ, মাতামহ, পিতামহী, মাতামহীরা
পরিত্যক্ত বসতবাড়ি, ভিটে-মাটি-গাছ-ফুল
বিপদের চরম খাদের ধারে ফেলে
সাঁতরে পেরিয়ে গেলেন নদীর এ-কুল থেকে ও-কুল।
নদীর উত্তাল জোয়ারে ভেসেছিলেন যখন,
শূন্য থেকে শূন্যের যাত্রাপথে—জানা ছিল না
কি ছেড়ে যাওয়া ন্যায্য, আর কি বা সঙ্গের সাথি করে
নিতে পারা সমীচীন।

শুভাঙ্গী মুখার্জীর ছবি

ধ্বংসের সেই প্রবল ঘূর্ণিপাকে—জমি-ঘর-স্বপ্নের নকশা-আঁকা দলীল,
ভালবাসার চিঠি, পুঞ্জিভূত সম্পদ
আর হৃদয়-ভরা বিশ্বাসের মৃত শরীরের মাঝে
তারা পরবাসী হলেন, ‘উদবাস্তু’ তকমা পেলেন
সহযাত্রীদের সাথে, জড়সড়, ঠাসাঠাসি জীবনযাপনে,
ক্রোধে-ক্ষোভে, কাঁটা তারের বেড়া পেরিয়ে।

আমার দিদিমার স্ফীত, ফ্যাকাশে শরীর সন্তানের জন্মের
স্বাক্ষর বহন করেছিল ভীড়াক্রান্ত কলোনির মাথা গোঁজা আধো আঁধারে
সঙ্গী উদবাস্তুদের নিঃশ্বাসের, উপস্থিতির ওমের মাঝে।
আর তাদের সন্তান, আমার পিতা-মাতারা, নতুন অস্তিত্বের ইমারত গড়ে,
নতুন স্বপ্নের নির্মাণ-বিনির্মাণে, সাঁতরে গেলেন এক বিচিত্র ঢেউ-এর অভিমুখে।
বেগবান, অদ্ভুত সেই প্রবাহের অপর নাম ‘ইমিগ্রেশন’, অভিবাসন।

ছুঁয়ে দেখেন নি তারা, জানে্ন নি কেমন তাদের পৈত্রিক বসতবাড়ির নাক-মুখ- চোখ
জানেন নি তারা, প্রকৃতই ‘জন্মভূমি’ কি কি অনুষঙ্গ বহন করে।
পূর্ববঙ্গ, ইষ্ট বেঙ্গল তাদের নষ্ট ছেলেবেলার খেলা-র সাথে এক হল, ঘর বাঁধলো,
সমস্ত এলোমেলো, অর্থহীন বিপ্লবের যেন এক অব্যর্থ প্রতিষেধক সে।

বাঙ্গাল উপভাষার কলতানে, পদ্মা নদীর প্রতি নামহীন আকুলতায়,
দুই বাংলার বিবিধ মেজাজে, মননে, গঠনে আত্মস্থ করলেন—
যে আগুন আর জলের সহাবস্থান তাদের অমোঘ এক সত্য।
ধীরে ধীরে, তারপর ক্রমশ সতেজ শব্দে অভিবাসী জীবনের ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠে…

বেজে ওঠে কালাপানি পেরনোর সঙ্কেত-ধ্বনি, সেই কালা পানি,
যাকে অতিক্রম করা ছিল পূর্বজদের চোখে মহাপাপ, আর সেই পাপের মহাপাতক আমি
বয়ে চলি নিদ্রাহীন নদীর কুহক ডাকে, সুদুর সমুদ্রের নামহীন হাতছানিতে।

আমার জন্মের নাড়ি, শেকড় ছিন্ন হল দুই দুই বার, তাই কি বিজাতীয় জমিতে খুঁটি বাঁধা আমার মন,
স্থানান্তরিত জীবনের সত্যের চাবুকের অভিঘাতে জাগিয়ে রাখে আমায় ঘোর অন্ধকারে?
মধ্যরাতের শীতল হাওয়ায় কখন দোর খুলে যায়, টালমাটাল আমি ইতি-উতি চলি।

আমার উত্তর-আধুনিক জীবনচর্যায়, ‘অভিবাসন’ এক অনুভব, এক চেতনা নিয়ে পাখা মেলে।
আমার ধূসর যন্ত্রনা এক অদ্ভুত প্লাস্টিক স্থীরতায় রুপান্তরিত হয়।
আর আমি, আমরা, শেকড়ছাড়া, নাড়িছেড়া সভ্যতার বীজ, ও আমাদের সন্তানরা,
সেই সব নামগোত্রহীন সংগ্রামের রঙের, কোলাহলের, আলোছায়ার নিঃশব্দ রূপক।

ছবি : শুভাঙ্গী মুখার্জী

আরো পড়ুনস্থানান্তরিত: একটি যাপনের কবিতা

আমার দিদিমার বাড়ি– কমলা দাশ

অদ্রীশ সিংহের ছবি

[কমলা সুরাইয়া (১৯৩৪ – ২০০৯) তার ছদ্মনাম  মাধবীকুট্টি নামে পরিচিত একজন ভারতীয় লেখক যিনি ইংরেজি ও মালায়লাম ভাষায় কবিতা, ছোটগল্প ও আত্মজীবনী রচনার জন্য অসম্ভব জনপ্রিয়। তিনি রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে জন্মেছিলেন। ১৯৯৯ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ও নিজের নাম পরিবর্তন করে কমলা সুরাইয়া রাখেন। তাকে তার প্রজন্মের নারীমুক্তি আন্দোলননের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তার জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র আমিমুক্তি পায়। তার রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘সামার ইন ক্যালকাটা ভারতীয় ইংরিজি সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে।

এই কবিতাটি তাঁর মুল ইংরিজি কবিতা ‘মাই গ্র্যান্ডমাদারস হাউস’-এর বাংলা অনুবাদ।]

দূরে, বহু দূরে একটি বাড়িতে আমি ভালবাসা পেয়েছিলাম…
কিন্তু সেই মহিলাটি, সেই ভীষন আপনজন মৃত্যুর দেশে চলে গেলেন।
বাড়িটাও কেমন নৈঃশব্দের কাছে আত্মসমর্পন করলো।
সাপ খেলে বেড়ায় বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে।

অদ্রীশ সিংহের ছবি

শৈশবকাল তখন, ভাল করে পড়তে শিখি নি
শরীরে রক্তস্রোত হীমশীতল হয়ে যেত রাতের আকাশে চাঁদের মত।
কতবার যে ভেবেছি—একবার যাই সে বাড়িটাতে,
উঁকিঝুকি মারি জানালার অন্ধ চোখের ভিতর দিয়ে
কিংবা কান পেতে শুনি জমাট, শীতল বাতাস—
অথবা গভীর বিষাদে এক বাহুসমান অন্ধকার কুড়িয়ে নিয়ে,
ভেবেছি নিয়ে আসবো, শুয়ে থাকবে সে
আমার শোবার ঘরের দরজার পিছনে,
এক দুঃখী কুকুরের মতো।

প্রিয়তম, তুমি কি বিঃশ্বাস করবে, করবে কি?
যে একদা আমি এমনি এক বাড়িতে বাস করতাম,
ভালবাসার বোধে সম্পৃক্ত আমি গর্বিত ছিলাম,
সেই আমি আজ দিকভ্রষ্ট, আগন্তুকদের দরজায় দরজায়
ভালবাসা ভিক্ষা করে ফিরি,
নিদেনপক্ষে কিছু ক্ষুদ্র প্রত্যাশার বিনিময়ে
আমি॥

ছবি : অদ্রীশ সিংহ

আরো পড়ুনআমার দিদিমার বাড়ি– কমলা দাশ