সন্দীপ মজুমদার

সন্দীপ মজুমদার

জন্ম ১৯৬৯। কলকাতা। পশ্চিম বঙ্গ। ভারত। পেশায় ওহাইও স্টেট্ ইউনিভার্সিটি (OSU) র অধ্যাপক ২০০৪ সাল থেকে। বর্তমান নিবাস কলম্বাস, ওহাইও, উত্তর আমেরিকা। অধ্যাপনার পাশাপাশি ভালোবাসেন গান-বাজনা, নাটক নিয়ে ব্যস্ত থাকতে । মাঝে মধ্যে এক আধটু লেখালেখি ও সাহিত্য চর্চা করতেও ভালোবাসেন।

সাদা কালো – ২য় পর্ব

সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবি সাদা কালো ২-৪

প্রথম পর্ব


পদার দৌলতে বাবলুদা একটুর জন্য বেঁচে গেছে। সেদিন যদি আর একটু দেরি হতো তাহলে হয়ত বাঁচতো না। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সেদিন ইমার্জেন্সির ডাক্তার মাধবীকে খুব বকুনি দিয়েছিল। “এতদিন কি করছিলেন? আগে আনতে পারলেন না?” তারপর গলা একটু নরম করে বললেন “এখন কড়া অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছি। রাতটা পার না হলে কিছুই বলতে পারছি না। কাল যদি দেখা যায় যে জ্বর কমেনি, তাহলে হয়ত কবজি থেকে হাতটা কেটে বাদ দিতে হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সেটা সফল নাও হতে পারে। ইনফেকশনটা কোনো ভাইটাল অরগানএ ছড়িয়ে পরেছে কিনা বলা খুব কঠিন”। শুনে মাধবী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবি  সাদা কালো ২-১“ওনার কোনো দোষ নেই। আমারই দোষ,” পদা এগিয়ে এসে বলেছিল। ডাক্তার কী বুঝলেন কে জানে, শুধু ভুরু কুঁচকে পদার দিকে একবার তাকিয়েছিলেন। সেদিন রাতটা পদা হাসপাতালে কাটিয়েছিল। মাধবী আর সে একই বেঞ্চের দুই প্রান্তে বসে। নিজের জন্য নয়, মাধবীর জন্য ঈশ্বরের কাছে অনেক প্রার্থনা করেছিল পদা। ভোরের দিকে ঘুমে নেতিয়ে পরেছিল। যখন চোখ খুলল, মাধবী তার পাশে নেই। নার্স বলল যে সে বাবলুদার কাছে গেছে। পদা ভয় পেয়ে দৌড় লাগালো। তাহলে কি বাবলুদা শেষ? বাবলুদার বেডের পাশে পৌঁছে দেখলো যে মাধবী বাবলুদার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে। বাবলুদা চোখ খুলে তাকিয়েছে। এখনো কথা বলার শক্তি নেই, কিন্তু পদাকে দেখামাত্র পরিচিতির হাসি দিয়ে তার চোখ দুটো যেন বলল “আমি ভাল হয়ে গেছি রে!” “তুমি ঘুমচ্ছিলে বলে আমি আর ডাকিনি,” পদার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মাধবী বলেছিল। পদা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসেছিল। তার কাজ শেষ। হোস্টেলে ফিরে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল। পদা রাতে ফেরেনি বলে থানা পুলিশ হয়েছিল। বাবাকে খবর দিয়ে আনানো হয়েছিল। মহারাজ শান্ত হয়ে পুরো ব্যাপারটা শুনলেন। “তোমার উচিত ছিল আমাদের জানিয়ে যাওয়া। কাজটা ভাল করোনি অনীক”। পদা মাথা নীচু করে শোনে। কিছু বলে না। সে খানিকটা অনুতপ্ত সকলকে এত চিন্তার মধ্যে ফেলার জন্য, তবে তার কিছু উপায় ছিল না। মহারাজও বোধহয় সেটা উপলব্ধি করেছেন। পদার বাবা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। মহারাজ তাঁকে মাঝবাক্যে থামিয়ে বললেন “আপনি রাগ করবেন না মিস্টার রায়চৌধুরী। সত্যি কথা বলতে, ওর পরিস্থিতিতে পরলে আপনিও হয়ত একি কাজ করতেন”। কথাটা শুনে বাবা চুপ করে গেল। “আজ অনীক যেটা করেছে সেটাই আমরা আমাদের ছেলেদের বরাবর শেখানোর চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু সেটা বাক্যেই থেকে যায়। অনীক আজ সেটাকে কাজে পরিণত করে দেখিয়েছে। এতে আমার খুব গর্ব বোধ হচ্ছে জানেন!” এই কথার ওপর বাবা আর কিছু বলার জোর পায়নি। চলে যাওয়ার আগে শুধু পদাকে আলিঙ্গন করেছিল। বাবার চোখে কি জলের আভাস দেখা দিয়েছিল সেদিন?

বাবলুদা এখন সেরে উঠেছে। ভাল আছে। সে এখন একটা স্টেশনারি দোকানে কাজ করে। পদার বাবাই চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছে। এ কাজে শারীরিক পরিশ্রম অনেক কম। মাধবীও এখন একজন বয়স্ক মহিলার দেখাশোনার কাজ করে। আয় বেড়ে যাওয়াতে ওরা এখন আর বস্তিতে থাকে না। নিজেদের ভাড়া বাড়িতে থাকে। বাগমারি ব্রিজের কাছে। পদা যখন বাড়িতে আসে, মাঝে সাজে দেখা করতে যায়। ওদের সাথে পদার সময় কাটাতে খুব ভাল লাগে। মনে হয় যেন নিজেরই দাদা বৌদি। একদিন বাবলুদা হঠাৎ বলল “হ্যাঁরে, সোনালি কেমন আছে?” বলে পদার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকালো। পদা বাবলুদার চোখ এড়িয়ে গেল। “সোনালি কে?” মাধবী প্রশ্ন করলো। “বাবলুদাকে জিজ্ঞাসা করো। ওর পুরোনো প্রেমিকা” পদা জবাব দিল। “আমার পুরোনো প্রেমিকা না তোর?” বাবলুদা এবারে সোজা হয়ে উঠে বসেছে। পদা কোনো জবাব দিচ্ছে না। জবাব সে দিতে চায় না। দিতে গেলেই ধরা পরে যাবে। “তুই কি ভাবিস আমি কিছু লক্ষ্য করিনি? কিছু বুঝিনি? সেদিন জেম সিনেমা থেকে ফেরার পথে তুই যে ভাবে ওর দিকে তাকাচ্ছিলিস, সে তাকানোর একটাই মানে হয়”। পদা দেখলো যে সে কোণঠাসা হয়ে পরেছে। মরিয়া হয়ে বলল “ধ্যাত! কি যে বল!” বাবলুদাও ছাড়বার পাত্র নয়। “সে তুই মানবিনা ঠিক আছে, কিন্তু আমি অত বোকা নই বুঝলি। ওই জন্যই তো ওইদিন তোকে বললাম ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে”। বাবলুদা আবার পদাকে অবাক করলো। মাধবী এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিল। খুব মজা পেয়েছে সে। মিষ্টি হেসে বলল “সত্যি অনীক?” পদা আর চেপে রাখতে পারলো না। “ওই একদিনেরই ব্যাপার। তারপর আর কিছু হয়নি। যাকগে, বাদ দাও, ওসব নিয়ে আর ভাবতে চাই না”। শেষ কথাটা বলতে গিয়ে পদার গলার স্বর একটা অন্য রূপ নিলো। বাবলুদা পদাকে খানিকক্ষণ মাপলো, তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে বলল “জীবনে কিছু কিছু জিনিষ চাইলেও ভোলা যায় না রে”। তারপর গলার স্বর হালকা করে বলল “চল আমরা খেয়ে নিই”। পদার সেদিন মনটা খুব হালকা লেগেছিল। এই সমস্ত ঘটনার একমাত্র সাক্ষী তো বাবলুদাই। তার কাছে এতদিন এই ব্যাপারটা লুকিয়ে রেখে সে হাঁপিয়ে উঠেছিল।

পদা এখন ক্লাস টুয়েল্ভএ পড়ে। পূজোর ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। মহাষ্টমীর সন্ধ্যা নেমে আসছে। বাড়িতে সে একা। অভ্যাসবশত সে ছাদে উঠে এসেছে। আকাশের রঙটা আজ সিঁদুরে লাল। তারই মধ্যে বেগুনি রঙের শরতের কয়েকটা ছোট্ট মেঘের টুকরো। তারা যেন মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পরেছে। ছাদ থেকে বাড়ির গলি, ওপাশের রাস্তা সব পরিষ্কার দেখা যায়। এরই মধ্যে অনেকে সেজেগুজে রাস্তায় বেরিয়ে পরেছে। বাচ্চারা এন্তার ক্যাপ ফাটাচ্ছে। পাড়ার প্যান্ডেল থেকে মাইকে কিশোর কুমারের গান ভেসে আসছে “আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো, আমার স্বপ্ন হয়ে কাছে দূরে যেখানেই থাকো…”। আজ পদার মনটা খুব বিষণ্ন লাগছে। ছাদের হাওয়া আর গানটার সুর মিলেমিশে যেন এক হয়ে গেছে। পদা পায়চারি করতে থাকে। একসময় হঠাৎ তার নজরে পড়লো সোনালি নিজের বাড়ি থেকে বেরচ্ছে। দূর থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না, তবে অষ্টমীর সাজ সে সাজেনি। তার পরনে সাধারণ ঘরোয়া একটা চুরিদার, হাতে একটা শান্তিনিকেতনি ব্যাগ। নিশ্চয়ই দোকানে যাচ্ছে। হয়ত এক্ষুনি ফিরবে আবার। যতক্ষণ না সোনালি দৃষ্টির বাইরে গেল, পদা চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখলো। আবার পায়চারি শুরু করলো। মিনিট খানেক পরে পায়চারি থামিয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে এল। একটা সুন্দর পাজামা পাঞ্জাবী পরলো। চুলটা পরিপাটি করে আঁচড়ালো। পদাকে ঠিক রাজপুত্তুরের মত দেখাচ্ছে। মুখ না দেখলে বোঝা যায় না যে মাত্র সতেরো বছরের একটা ছেলে। চওড়া কাঁধ, বলিষ্ঠ দেহ। রাস্তায় নেমে সোনালি যেদিকে গেছে, গলির সেদিককার মুখে দাঁড়িয়ে পদা অপেক্ষা করতে লাগলো। সোনালির জন্য অপেক্ষা। কিন্তু কেন সে নিজেই জানে না। মিনিট পনেরো কেটে গেলো। পদা ছটফট করতে লাগলো। ঘনঘন ঘড়ি দেখছে। তাহলে কি সোনালি সে আসার আগেই ফিরে এসে বাড়িতে ঢুকে গেছে? কিংবা গলির অন্য দিক দিয়ে ঢুকেছে বাড়িতে? এই সব চিন্তায় যখন সে মগ্ন, দেখলো সোনালি ফিরছে। মাথাটা সামান্য এক দিকে হেলানো। চুল খোলা। হাওয়ায় উড়ছে। মুখ ঢেকে যাচ্ছে বারবার। সে বাঁহাত দিয়ে চুল ঠিক করার চেষ্টা করছে। সক্ষম হচ্ছে না। পদা গিয়ে সোনালির পথ আটকে দাঁড়ালো। প্রায় ধাক্কা লেগে যাচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে সোনালি মুখ তুলে চাইলো। পদাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গিয়ে চিনতে পেরে থমকে দাঁড়ালো। “একি অনীক! তুমি বাড়িতে কবে এলে? এখানে দাঁড়িয়ে? কারো জন্য অপেক্ষা করছো?” পদা এক মুহূর্ত সময় নিলো, তারপর সোনালির দিকে সোজা তাকিয়ে বলল “হ্যাঁ তোমার জন্য অপেক্ষা করছি”। “আমার জন্য? কি ব্যাপার বলতো? বাড়িতে কিছু হয়েছে?” সোনালি খুব স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করলো। “না তোমার সাথেই কথা ছিল”। পদার কন্ঠস্বরে হয়ত কিছু একটা ছিল। সোনালি গম্ভীর হোলো। পদার দিকে তাকিয়ে বলল “কি? বলো”। “তুমি আমার সাথে আজ ঠাকুর দেখতে যাবে?” সোনালি এক মুহূর্ত সময় নিল। যেন সে নিজের কানকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। তারপর মিষ্টি করে হেসে বলল “তা হয়না অনীক!” বলে পদাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। পদার যতক্ষণে হুঁশ ফিরলো ততক্ষণে দেখলো সোনালি নিজের বাড়ির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। পদা চোখে অন্ধকার দেখছে। সে হয়ত ভারসাম্য হারিয়ে এক্ষুনি রাস্তায় পড়ে যাবে। তার কান ঝাঁঝাঁ করছে। এ সে কি করলো! এতদিনেও সে কি করে বুঝতে অক্ষম হোলো কেন রেঠ বাটলার সোনালিকে এত আকর্ষণ করে? রেঠ বাটলার যে নিজেকে মেয়েদের দিকে ছুঁড়ে দেয় না। দৌড়ে বাড়িতে প্রবেশ করলো পদা। নিজের ঘরে ঢুকে ছিটকিনি আটকে দিল যাতে কেউ বিরক্ত না করতে পারে। বাইরে ঢাক ঢোল পিটিয়ে মহাষ্টমীর পুজো শুরু হয়েছে। পদা ঘরের আলো নিভিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে তার ছ-ফুট দেহটাকে এলিয়ে দিলো বিছানায়। তার সতেরো বছরের নরম মনটা আর সহ্য করতে পারলো না জীবনের এই নিষ্ঠুরতা। পদা কাঁদলো। অনেকক্ষণ ধরে। যে আশার ছোট্ট পাখিটাকে এতদিন সে যত্ন করে পুষে রেখেছিল, আজ তার মৃত্যু হোলো। পদা কাঁদবে না’ই বা কেন?


সেই ঘটনার পর দু বছর কেটে গেছে। এই ধরনের ঘটনা মানুষ চট করে ভুলতে পারে না, তবে সময়ের সাথে সাথে তা খানিকটা ফিকে হয়ে যায়। পদারও তাই হয়েছে। মাঝে মাঝে তার মনের গভীর থেকে প্রশ্ন আসে “আশার পাখিটাকে কেন মারলে অনীক? বেশ তো ছিল!” সে নিজেকে নিজেই উত্তর দেয় “বেশ কোথায় ছিল? যে প্রায় মৃত তাকে বেশী দিন বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ?” কিন্তু সে জানে যে উত্তরটার মধ্যে কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গেছে।
পদা এখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজিক্স অনার্সের ছাত্র। বাবার খুব ইচ্ছা ছিল যে সে ইঞ্জিনিয়ারিং পরে। তবে পদাকে ইঞ্জিনিয়ারিং জিনিসটা খুব একটা আকর্ষণ করে না। বড্ড কাঠখোট্টা লাগে তার। নরেন্দ্রপুরে পড়াকালীন পদার পদার্থ বিজ্ঞানের প্রতি একটা টান জন্মায়। মূলত সত্যেন্দ্রনাথ বসু সম্পর্কে জেনে। তখনও পদা কোয়ান্টাম ফিজিক্স বিষয়ে বিশেষ কিছুই বোঝে না বা জানে না। কেবল স্কুলের লাইব্রেরিতে ফিজিক্সের বই ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে তার হঠাৎ একদিন নজরে পরে এই ভদ্রলোকের নাম। তার নামের সাথে যুক্ত বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আল্বার্ট আইন্সটাইন এর নাম। শুধু তাই নয়, দুজনের নাম দিয়ে নামকরণ হয়েছে পদার্থ বিজ্ঞানের একটি মুখ্য প্রণালি—বোস-আইন্সটাইন স্ট্যাটিস্টিক্স। তার নামেই সৃষ্টি হয়েছে বোসোণ শব্দটি। সমস্ত তথ্য জানার পর পদার মনে এক অদ্ভুত শিহরন জাগে। কলকাতারই ছেলে। উত্তর কলকাতায় পদারই বাড়ির কাছে থাকতেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশুনা করেছেন। অথচ সমস্ত বিশ্বের লোক এক বাক্যে তার নাম জানে। মানুষটিকে কোনোদিন চেনেনি, জানেনি, কিন্তু গর্বে ভরে গেল পদার বুক। এরপরই সে মনস্থির করে নেয় যে পদার্থ বিজ্ঞানেই তার স্থান। প্রথম প্রথম পদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আপত্তি ছিল না। বিশেষত বাবা যখন চায়। মহারাজের সাথে কথা বলে জেনেছিল যে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করলেও পরবর্তীকালে পদার্থবিজ্ঞান জড়িত গবেষণার সুযোগ থাকবে। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে দুর্গাপুজোর সেই ঘটনার পর পদার আর মানসিক বল ছিল না যে ছ’মাসের মধ্যে জয়েন্ট এন্ট্রেন্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে সেই পরীক্ষায় ভাল ফল করবে। অতএব সেই পরিকল্পনাকে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হয়েছিল। উচ্চমাধ্যমিকে পদার ফল ভালোই হয়েছিল। ততদিনে সে একটু সামলে উঠেছে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ফিজিক্সের এন্ট্র্যান্স পরীক্ষাতেও ভালো ফল করেছিল। পরে জেনেছিল যে সে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। অতএব ফিজিক্স অনার্সে অ্যাডমিশন পেতে তাকে বেগ পেতে হয়নি।
সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবি  সাদা কালো ২-২প্রেসিডেন্সি কলেজ পদার খুব ভালো লাগছে। নরেন্দ্রপুরের থেকেও বেশী। এই কলেজের প্রতিটা ইট পাথরের মধ্যে একটা ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে কোয়ান্টাম ফিজিক্স ক্লাসে পদা অন্যমনস্ক হয়ে পরে। প্রফেসর আর সত্যেন্দ্রনাথের মুখটা মিলেমিশে এক হয়ে যায়। সত্যেন্দ্রনাথের সে মোটে দু একটা ছবি দেখেছে বইয়ের পাতায়। তা সত্ত্বেও। প্রেসিডেন্সিতে ঢোকার পর মুশকিল তবে একটা হয়েছে। পদাকে এখন আবার বাড়িতে থাকতে হয়। সেটা পদার ভাল লাগে না। যে পাড়ায় ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে সেই পাড়াতে থাকাটা এখন একটা ভীতিতে পরিণত হয়েছে। যদি আবার সোনালির মুখোমুখি হয়ে পরে? একদিন হয়েও ছিল। পদা মুখ নীচু করে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল। এখন তার আত্মসম্মান বোধ খুব প্রখর। আবার পরে গেলে আর যে উঠতে পারবে না সে তা জানে।
কলেজে পদার অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে। সে দেখতে সুন্দর বলে অনেক মেয়েই তার বন্ধু হতে চায়। পদা সেটা বোঝে। তাদেরই মধ্যে একজনের নাম নন্দিতা। নন্দিতা পদার থেকে একেবারেই আলাদা। বড়লোক পরিবারের মেয়ে। সল্টলেকে বিরাট বাড়ি। বারো বছর বয়েস অবধি বড় হয়েছে আমেরিকায়। তার চলনবলন কথাবার্তা সবই খুব সাবলীল, খুব স্মার্ট। তার মত মেয়ে সচরাচর উত্তর কলকাতার বাঙ্গালিয়ানার মধ্যে মানুষ হওয়া বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পরা কোন ছেলের ধারে কাছে ঘেঁষবে না। কিন্তু নন্দিতা অন্যরকম। সে আমেরিকা থেকে সে দেশের ভালো কিছু শিক্ষা সঙ্গে করে বয়ে এনেছে। কাউকে ভাল করে না জেনে না বুঝে পক্ষপাতিত্ব দেখানো বা সেই মানুষটাকে বিচার করা সে একদম পছন্দ করে না। নন্দিতা ইকোনমিক্স এর ছাত্রী। পদার সাথে তার আলাপ হয় ঘটনাচক্রে। একদিন প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টিতে পদা কলেজ থেকে সবে বেরিয়েছে। বেরোনো মাত্র ঝড়ের ঝাপটায় তার ছাতা গেছে উল্টে। পদা যখন ছাতা সামলাতে ব্যস্ত, তখন একটা সাদা টয়োটা গাড়ি থামল তার সামনে। জানালা নামানো। জানালার ওপাশ থেকে একটি মেয়ে জোড়ালো কন্ঠে বলল “তুমি ফিজিক্স অনার্স না? কোথায় থাকো তুমি?” “গড়পার” উত্তর দিল পদা। “গড়পার? সেটা কোথায়?” প্রতিপ্রশ্ন এল গাড়ির ভেতর থেকে। “মানিকতলার কাছে”। “ও আচ্ছা। আমি তো মানিকতলা ফুলবাগান হয়েই যাব। তুমি চাও তো ছেড়ে দিতে পারি”। পদা একটু ইতস্তত করলো। মেয়েটাকে সে চেনে না। তবে আন্দাজ করা শক্ত নয় যে প্রেসিডেন্সিতেই পড়ে। গাড়ির ভেতর উঁকি দিয়ে দেখলো যে ড্রাইভার ছাড়া আর কেউ নেই। “ঠিক আছে,” বলে সামনের দরজা খুলে উঠতে যাচ্ছিল। “ওখানে নয়। পেছনে চলে এসো। পদা পেছনে উঠলো। উঠে কোনোরকমে ছাতাটাকে গুটিয়ে বলল “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। সরি! আমার জামাটা একেবারে ভেজা। আপনার সিটে জল পরছে”। “আরে, বৃষ্টিতে তো জল পরবেই। ওতে কিছু এসে যায় না। বাই দা ওয়ে, বলতে ভুলে গেছি, আমার নাম নন্দিতা। আমি ইকো অনার্স”। পদা কোন উত্তর দিল না। কেবল একটা ধন্যবাদের হাসি। লক্ষ্য করলো যে মেয়েটার গায়ের রঙটা একটু চাপা, কিন্তু মুখটায় প্রচণ্ড বুদ্ধির ছাপ। আর হাসলে অস্বাভাবিক সুন্দর একটা টোল পরে গালে। “তুমি প্লিজ একটু ওকে বুঝিয়ে দাও তোমার বাড়িটা কোথায়”। পদার খুব আশ্চর্য লাগছে যে মেয়েটা বিনা দ্বিধায় ওকে প্রথম থেকেই তুমি বলে সম্বোধন করছে, অথচ ও আপনি থেকে বেরোতে পারছে না।

সেই প্রথম দেখা। সময়ের সাথে সাথে পদা নন্দিতার ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে। নন্দিতা মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে। পদাকে সেটাই আকৃষ্ট করে। তার অনেক বন্ধু। পদা তাদের মধ্যেই একজন। তাদের বন্ধুত্বে কোন স্ত্রী-পুরূষের ভেদাভেদ নেই, নেই কোন ঘনিষ্ঠতা। শুধু আছে একে অপরের ওপর অগাধ বিশ্বাস। নন্দিতাকে পদা সব মনের কথাই বলতে পারে। একটা কথা বাদ দিয়ে।
একদিন কলেজের পর পদা, নন্দিতা, আর পদার নরেন্দ্রপুরের বন্ধু রাজু মিলে ঠিক করলো যে ধর্মতলা এলাকায় গিয়ে একটা সিনেমা দেখবে। হয়ত সিনেমা দেখার পর একটা রেস্তরাঁয় ঢুঁ দেবে। রাজুও ফিজিক্স অনার্স। ঘটনাচক্রে জানা গেছে যে নন্দিতা আর রাজু নাকি দুঃসম্পর্কের ভাই বোন। পদার এখনো মনে আছে রাজু কথাটা পেড়ে ঠাট্টা করে নন্দিতাকে বলেছিল “কি মাইরি! ভেবেছিলাম তোর সঙ্গে প্রেম করব! আবার নতুন করে মেয়ে পটাতে হবে!” সবাই এই কথায় খুব প্রাণ খুলে হেসেছিল। পদার নিজেকে সেদিন খুব ভাগ্যবান মনে হয়েছিল; এরকম কয়েকজন বন্ধু পাওয়াতে। কলেজ থেকে বেরিয়ে ওরা তিনজন হাঁটতে শুরু করল। জানুয়ারি মাসের হালকা শীত। হেঁটে বেশ আরামই লাগে। হাঁটতে হাঁটতে ডালহৌসি ছাড়িয়ে গেছে যখন ওরা, তখন রাজু বলল “কি সিনেমা দেখছি আমরা?” “এ পাড়ায় এসেছি যখন একটা হলিউডের সিনেমাই দেখা উচিত” মন্তব্য করলো পদা। সে হলিউড সিনেমা দেখতে ভালোবাসে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার কৌতূহল তার ইদানীং খুব বেড়েছে। এই সমস্ত সিনেমা দেখলে সেই কৌতুহল খানিকটা তৃপ্ত হয়। “কি কি চলছে?” নন্দিতার প্রশ্ন। “নিউ এম্পায়ারএ টাওয়ারিং ইনফারনো, লাইটহাউসে কি চলছে জানি না, আর গ্লোবে গন উইথ দ্যা উইন্ড” উত্তর দিল রাজু। “সবই আমার দেখা,” নন্দিতা বলল “তবে গন উইথ দ্যা উইন্ড আমি হাজার বার দেখতে পারি”। “ঠিক হ্যায়, তাহলে গ্লোবেই চলো সবাই” রাজু বলল। পদা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরলো। “টাওয়ারিং ইনফারনো দেখলে হয় না? অন্যটা আমার দেখা”। ঠিক হোলো যে যেহেতু রাজু আর নন্দিতার দুটোই দেখা, আর পদার টাওয়ারিং ইনফারনো দেখা নয়, ওটাতেই যাওয়া হবে। কিন্তু নিউ এম্পায়ারে পৌঁছে দেখা গেল যে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। পরের শো অনেক দেরিতে। উপায় নেই দেখে সবাই গ্লোবের দিকে এগোতে যাবে, হঠাৎ পদা বেঁকে বসলো। “আমি যাব না। তোরা যা”। “কেন?” প্রশ্ন করলো নন্দিতা। “বললাম তো, আমার দেখা”। “তাতে কি হয়েছে? আমার তো বহুবার দেখা। আমি তো তাও যাচ্ছি”। “আমার ভাল লাগছে না। তোরা যা”। “কেন তোর কী হয়েছে?” নন্দিতা নাছোড়বান্দা। “আমি যাব না, তোরা যা”। “তুই আগে বল তোর কি হয়েছে”। পদা হঠাৎ রেগে গেল। নন্দিতার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলো। “আমার কিচ্ছু হয়নি। বললাম তো যাব না। আমাকে একা ছেড়ে দে”। পদার গলা উঁচুতে ওঠার দরুন আশেপাশের লোকজন এখন ওদের দেখছে। নন্দিতা আর কথা বাড়ালো না। রাজুর দিকে তাকিয়ে বলল “চল”। বলে পদাকে ছেড়ে এগিয়ে গেল। পদা খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদের যাওয়াটা দেখলো। তারপর আস্তে আস্তে রাস্তায় পা রেখে ফুটপাথের কিনারায় উবু হয়ে বসে পরলো। চোখ বুজে মুখ ঢাকলো নিজের হাতের পাতায়।


সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবি  সাদা কালো ২-৩কলকাতায় বছর খানেক হোলো পাতাল রেল চালু হয়েছে। কিন্তু পদার এখনো চড়া হয়ে ওঠেনি। তার বাড়ি গড়পার থেকে কলেজ স্ট্রিট সে বেশির ভাগ দিন হেঁটেই চলে যায়। হাঁটতে পদার খুব ভাল লাগে। স্বাস্থ্যের পক্ষে তা ভালো তো বটেই, সব থেকে বড় কথা এই হাঁটার সময়টুকু পদার সম্পূর্ণ নিজের। এই সময় নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে সে। সত্যি কথা বলতে, পাতাল রেলে চড়ার প্রয়োজন সে কখনো বোধ করেনি। এক রবিবার ভোর বেলা উঠে পদা গেল ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে। সারাদিন সেখানে কাটানোর পর, বিকেল বেলা যখন বাড়ি ফিরছে তখন হঠাৎ তার মনে হোলো বাসে না ফিরে মেট্রোতে ফিরলে কেমন হয়? বন্ধুবান্ধবদের কাছে পদা আগেই শুনেছে যে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির সবথেকে কাছের স্টেশান হোলো রবীন্দ্র সদন। কলকাতা শহরের দক্ষিণ ভাগের রাস্তাঘাট পদা সেরকম ভালো চেনে না। রাস্তায় দু একজন ট্যাক্সি ওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে মোটামুটি একটা ধারণা করে নিয়ে পদা রবীন্দ্র সদনের দিকে হাঁটা লাগালো। দরকার হলে আবার রাস্তায় জিজ্ঞেস করে নেবে। হাঁটার তো এইটাই সুবিধা। তবে সেদিন মেট্রো স্টেশান খুঁজে পেতে পদাকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। মিনিট কুড়ির মধ্যেই সে স্বচ্ছন্দে স্টেশনে পৌঁছে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে পাতালে নেমে পদার তাক লেগে গেল। এই ধূসর কলকাতা শহরে এ কী সৃষ্টি! সত্যি দেখার মত। ঝকঝক করছে স্টেশান। কোথাও এক ফোঁটা নোংড়া নেই। সব কিছু সাজানো গোছানো; মনে হচ্ছে যেন সে বিদেশি ম্যাগাজিনের পাতার মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে মনে আজ সে ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে মাথা নত করলো, তাদের মূল্যটা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করলো। মনে মনে ভাবলো যে মাকে নিয়ে এসে একদিন চড়াতেই হবে। এইসব ভাবতে ভাবতেই ট্রেন এসে পরলো। রবিবার বলে ট্রেন মোটামুটি ফাঁকা। পদা সিট পেয়ে গেল। জানালার বাইরে কিছু দেখার নেই, তাই পদা কম্পার্টমেন্টেরই সামনের দিকে চেয়ে রইলো। তার সমস্ত অনুভূতি দিয়ে সে ট্রেনের গতিটা মাপার চেষ্টা করছে। ময়দান স্টেশনে কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে এক যুবক যুবতীও উঠেছে। ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে। হঠাৎ একটা গলার স্বরে পদার ঘোর কাটলো। প্রথমে পদা তার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আবার মনোযোগ দিয়ে শুনলো। হ্যাঁ, সে ঠিকই শুনেছে। এ গলার স্বর সে ভুল করতে পারে না। কথোপকথনটির শব্দ আসছে তারই কম্পার্টমেন্টের অন্য প্রান্ত থেকে, কম্পার্টমেন্টের পেছন দিকটায়। যুবক যুবতীর আলাপ আলোচনা। চাপা স্বরে। কিছু কিছু শব্দ ও বাক্যের অংশ বিশেষ ইংরেজিতে। প্রেমালাপ না হলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এই যুবক যুবতীর নিছক বন্ধুত্বের উর্ধেও একটা সম্পর্ক আছে। পদা ভাবছে কি করবে। কানে শুনেছে ঠিকই কিন্তু চোখে না দেখলে সে নিশ্চিত হতে পারছে না যে তার অনুমান ঠিক কিনা। আবার ঘুরে তাকাতেও তার দ্বিধা হচ্ছে। যদি চিনে ফেলে? পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে যখন ট্রেন থামল, পদা উঠে দাঁড়ালো। ভাবটা এমন করলো যেন সে নেমে যাবে, কিন্তু নামার বদলে সে সিট বদল করে অন্য একটা সিটে বসলো—এমন একটা সিট যেখান থেকে সে ঘাড় ঘুরিয়ে অনায়াসে যুবক যুবতীকে দেখতে পাবে, কিন্তু তারা তাকে চট করে চিনতে পারবে না। ট্রেন যখন আবার চলতে শুরু করলো, সুযোগ বুঝে পদা আস্তে আস্তে কায়দা করে তার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো। তার অনুমান সঠিক। সোনালি! পরনে পাশ্চাত্য কায়দার একটা নেভি ব্লু ব্লাউজ আর জিন্স। চুল খোলা। অপূর্ব দেখাচ্ছে তাকে। তার সঙ্গের যুবকটিও যথেষ্ট সুপুরুষ। হয়ত পদার মত অতটা নয়, তাও। পদার খুব ইচ্ছা করছিলো আরো কিছুক্ষণ সোনালিকে দেখতে, কিন্তু সে ঝুঁকি সে আর নিল না। যদিও তার গন্তব্য স্টেশন ছিল গিরীশ পার্ক, সে সেন্ট্রাল স্টেশনে তড়িঘড়ি করে নেমে গেলো। সোনালির সামনাসামনি হওয়ার ভীতি সে আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এই ঘটনার পর বছরখানেক কেটে গেছে। পদা এখন ফাইনাল ইয়ারে। কর্নেল ইউনিভারসিটির পদার্থ বিজ্ঞানের এক অধ্যাপকের সাথে তার অনেকদিন যাবত চিঠি আদান-প্রদান চলছে। ভদ্রলোক এখনো কোনো কথা দেননি, তবে জানিয়েছেন যে GRE পরীক্ষায় পদার ফল যদি ভাল হয়, তাহলে তার ছাত্রবৃত্তি পাওয়ার একটা ভাল সম্ভবনা আছে। পদা শীঘ্রই GRE পরীক্ষায় বসবে। সেই পরীক্ষার জন্যই পদা এক ছুটির দিন সকালে পড়াশুনা করছিলো। মা এসে দরজায় দাঁড়ালো। “আজ সন্ধ্যেবেলায় কি তুই বাড়িতে থাকবি?” “হ্যাঁ সেরকমই তো প্ল্যান। কেন বলতো?” মা কি যেন একটু ভাবলেন। “আমাকে একটু পাশের মানুদিদের বাড়িতে নিয়ে যাবি?” পদা একটু অবাক হোলো। “সে তো তুমি একাই যেতে পারো। আমাকে কেন যেতে বলছো?” মা বেশ খানিকটা ইতস্তত করে তারপর বললেন “শুনলাম সোনালির শরীরটা খুব খারাপ। তুই গেলে ওর সাথে একটু কথা বলতে পারবি”। পদার মাথার মধ্যে হাজারটা চিন্তার দৌড় শুরু হোলো। সোনালির শরীর খারাপ? কিন্তু মা ব্যাপারটাকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছে কেন? শরীর খারাপ তো সকলেরই হয়। তাহলে কি আরো কিছু আছে এর মধ্যে যেটা মা বলতে চাইছে না? কিন্তু পদা গিয়েই বা কি করবে? তার সাথে কথা বলে সোনালির কীই বা লাভ হবে? সোনালির তো প্রেমিক আছে। সে আসে না? মা সম্ভবত এসব জানেও না। “কি হয়েছে ওর?” পদা প্রশ্ন করলো। “তা তো জানি না। মানুদি খুব কাঁদছিলেন। বললেন মেয়েটা সারাদিন বাড়িতেই থাকে। কোত্থাও যায় না। কারো সাথে কথা বলে না। খালি শুয়ে থাকে”। অদ্ভুত ব্যাপার! কি হয়েছে সোনালির? পদা ভাবতে থাকে। “ঠিক আছে আমি নিয়ে যাব তোমায়”। মা খুশী হলেন। একটু হেসে বললেন “সাতটা নাগাদ যাব তাহলে”। পদা ঘাড় নাড়লো ।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে পদার বুকের ধুকপুকানিও বাড়তে থাকলো। সে সোনালিদের বাড়িতে গিয়ে কি করবে? সোনালিকে সে কি বলবে? সোনালিই বা তার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে কেন, যেখানে সে কারো সাথে কথা বলেনা? অথচ সোনালির কি হয়েছে সেটা জানারও তার প্রচণ্ড কৌতূহল। একবার নিজেকে বোঝালো যে গিয়ে স্রেফ বসার ঘরে মা’র সাথে বসে থাকবে, তারপর চলে আসবে। এতে এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কি আছে? কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হোলো যে ওরা যদি ওকে সোনালির ঘরে ওর সাথে একান্তে দেখা করতে পাঠিয়ে দেয় তাহলে? পদার ছটফটানি বাড়তেই থাকলো। শেষে আর না থাকতে পেরে বিকেল চারটে নাগাদ সে বেরোলো। বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। সে লক্ষ্য করেছে যে হাঁটলে তার মনটা শান্ত হয়। হাতিবাগান, শ্যামবাজা্‌র, সব ছাড়িয়ে অবশেষে সে পৌঁছালো গঙ্গার ধারে বাগবাজার ঘাটে। সন্ধে হয়ে গেছে কিন্তু গঙ্গার জলে তখনো ছোট-ছোট কিছু ছেলে-মেয়ে দাপাদাপি করছে। সেই মুহূর্তে পদার ইচ্ছা করলো ওদের মত হয়ে যেতে। পদা ঘাটের সিঁড়ির ওপর বসলো। দূরে গঙ্গার বুকে কয়েকটা বজ্রা ভেসে রয়েছে। আর কয়েকমাস পরেই পদা বিদেশে চলে যাবে। সোনালিও তার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবে। এই সময় আবার নতুন করে মনটাকে নাড়া দাওয়ার কি প্রয়োজন? সাধারণ অসুখ করেছে হয়ত, নিশ্চয়ই শিজ্ঞির ঠিক হয়ে যাবে। মা হয়ত বিনা কারণেই ব্যাপারটার গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। কিংবা হয়তো ওর প্রেমিকের সাথে মন কষাকষি হয়েছে। সে তো আকছার হয়েই থাকে। এই সব ভেবে পদা ঠিক করলো যে সে আর যাবে না সোনালিদের বাড়ি। গেলেই আশা। আশা মানেই আশার মৃত্যু।
রাত দশটায় পদা বাড়ি ফিরলো। খানিক পর মা’র আবির্ভাব হোলো। পদা যে মাকে নিয়ে যায়নি সোনালিদের বাড়ি সে নিয়ে মা কোন কথাই বলল না। শুধু বলল “খাবি না?” মা’র দিকে পদা তাকাতে পারলো না। অন্যদিকে তাকিয়েই বলল “একটু কাজে আটকে পরেছিলাম মা। আমি সরি। কাল তোমায় ঠিক নিয়ে যাব”। “তার আর দরকার হবে না। আমি একা একাই দেখা করে এসেছি” বলে মা ঘুরে দরজার দিকে এগুলো। পদা আর থাকতে পারলো না। “কেমন আছে ও?” “ভাল নেই”। ভাল নেই? ভাল নেই মানে? কি হয়েছে? পদার মনে আবার হাজার প্রশ্ন। “কি হয়েছে ওর?” প্রশ্ন করলো পদা। “তা তো জানিনা। সেরকম কিছু বলল না ও। খালি বলল ‘একটা খারাপ ছেলের পাল্লায় পড়েছিলাম মাসিমা। চিন্তা কোরো না। আস্তে আস্তে আমি ঠিক হয়ে যাব’। মেয়েটার জন্য মায়া লাগে। এত হাসিখুশি ছিল!” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা পদার ঘর ছেড়ে চলে গেল। পদা পাথর হয়ে বসে রইল।


মে মাস। প্রচণ্ড গরম পরেছে কলকাতায়। বিকেল চারটে নাগাদ পদা বাড়ি থেকে বেরোল। আকাশটা একটা ফ্যাট ফ্যাটে সাদা রঙ। তাতে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। পদা যাবে নন্দিতার বাড়ি। সল্ট লেকের লাবনী অঞ্চলে। নিউ এম্পায়ার সিনেমার সামনের সেই ঘটনার হপ্তা খানেকের মধ্যেই পদা আর নন্দিতার মিটমাট হয়ে গিয়েছিল। পদা ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল। ক্ষমার বিনিময়ে অবশ্যই সোনালি সংক্রান্ত সমস্ত ঘটনা তাকে খুলে বলতে হয়েছিল নন্দিতাকে। একদিন কলেজের সিঁড়িতে বসে অনেকটা সময় নিয়ে পদা সোনালির সাথে প্রথম দেখা হওয়া থেকে শুরু করে দুর্গাপুজোর ঘটনা অব্ধি সব কাহিনি নন্দিতাকে খুলে বলল। নন্দিতা খুব মন দিয়ে শুনলো। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল কোনো কথা না বলে। পদা উদ্গ্রীব হয়ে রইলো নন্দিতার বক্তব্য শোনার জন্য। বেশ খানিকক্ষণ পর নন্দিতা বলল “আই ডোন্ট ব্লেম হার অ্যাট অল। আমার তো মনে হয় পুরোটাই তোর মনগড়া। প্লাটোনিক! আই থিঙ্ক ইউ নিড টু মুভ অন”। পদার এই কথাগুলো মোটেই পছন্দ হোলো না। মুভ অন বললেই করা যায় নাকি? সে অনেক চেষ্টা করেছে। আজও করে চলেছে। অবশ্য সে জানে যে সে নিজেই এক সময় ভেবেছিল যে জেম সিনেমার ওই মুহূর্তগুলো, সোনালির সেই মাউথ অরগান শোনানোর আবদার, ওগুলোর কোনোটারই কোন গূঢ় অর্থ নেই। কিন্তু অন্যের মুখে একই কথা শুনতে ওর আঁতে লাগলো। পদা অবশ্য কোন জবাব দেয়নি। চুপ করে ছিল। কাউকে চোখের সামনে দুবেলা উঠতে বসতে দেখলে ভুলে যাওয়াটা অনেক বেশি কঠিন। পরিস্থিতির সম্মুখীন না হলে বোঝা যায়না সেটা কত কঠিন। তবে এবারে সে সাগর পারি দিয়ে বিদেশে চলে যাবে। মুভ অন করাটা অনেক সহজ হবে।
শেষ অব্ধি কর্নেল ইউনিভারসিটিতেই পড়তে যাচ্ছে পদা। ফিজিক্সএ পিএইচডি। তার গবেষণার বিষয় হবে কোয়ান্টাম কনফাইনমেন্ট। যে প্রফেসরের সাথে অনেকদিন ধরে যোগাযোগ পদার, সেই প্রফেসর জোন্সই পদাকে একটা ভালো ছাত্রবৃত্তি পাইয়ে দিয়েছেন। সাধারণত আগস্ট অথবা সেপ্টেম্বর মাসে নতুন ছাত্ররা শুরু করে, কিন্তু বৃত্তির চিঠিপত্র দেরিতে আসাতে পদার ওই সময় যাওয়া সম্ভব হবে না। ভিসার অ্যাপ্লিকেশন পাঠাতে দেরি হয়ে গেছে। সে পরের বছর জানুয়ারি মাসে আমেরিকা যাত্রা করবে। বাবা খুব খুশী হয়েছেন। মা’র অবশ্য খুব মন খারাপ। এখন থেকেই কাঁদেন আড়ালে।
কাঠফাটা রোদে পদা এগিয়ে চলল শুকিয়া স্ট্রিট বাস স্টপের দিকে। পৌঁছে একটা আডভার্টাইজমেন্ট বোর্ডের ছায়ায় দাঁড়ালো। বিকেল হয়ে গেছে কিন্তু অস্বাভাবিক গরম বলে রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা। কয়েকটা বাস ধুঁকে ধুঁকে চলেছে। বাসে গোনাগুনতি কয়েকটা লোক। পদা দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই, তার বাস আসার কোন নাম গন্ধ নেই। একটু পরে বেরলেই বোধহয় ভাল হতো। কিন্তু নন্দিতা বারবার শাসিয়েছে “আমি কিন্তু ঠিক ছটায় বেরিয়ে যাব টিউশানিতে। এক মিনিট দেরি করলে আমাকে আর পাবি না”। পদা তাই তাড়াতাড়ি বেরিয়েছে। পরশু সকালে সে ভিসার জন্য আমেরিকান কন্সুলেটএ যাবে। তাই একটা জরুরি কাগজ নন্দিতার কাছ থেকে নিতে হবে। পদা ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইল বাসের জন্য। কোন উপায়ও নেই। এখান থেকে নন্দিতার বাড়ি হেঁটেও যাওয়া যায় না। একবার আকাশের দিকে তাকালো। আকাশটা এখনো সেই ফ্যাটফ্যাটে সাদা। তবে দূর দক্ষিণ দিগন্তে মনে হোলো যেন একটা সামান্য কালচে আভাষ। ঘড়ি দেখলো একবার। ৪:৫০। নন্দিতার বাড়িতে কি আর ছটার মধ্যে পৌঁছানো যাবে? মনে হয় না। হঠাৎ পদার মনে পরলো যে মা’র জন্য একটা প্রেসারের ওষুধ কিনতে হবে। ফুরিয়ে গেছে। আজ রাতেই দরকার। পদা মনস্থির করলো যে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করে বরং ওষুধটা এখনই কিনে নেবে। বাস যদি আসে তো আসবে। এমনিতেও দেরি হয়ে গেছে। সে সারকুলার রোডের বাঁদিক বরাবর দক্ষিণ মুখো হয়ে রাজাবাজার সাইন্স কলেজের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। মাঝে মাঝে পেছনে তাকিয়ে দেখছে তার বাস আসছে কিনা। দক্ষিণ দিগন্তটা এখন সত্যিই ঘন কালো রূপ নিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন একটা কালো সৈন্যবাহিনী তীব্র বেগে ধেয়ে আসছে সাদা সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণ করতে। পদা আকাশের দিকে চোখ রেখে এগিয়ে চললো। কি অপূর্ব এই মেঘের খেলা। আর দু মিনিটের মধ্যেই পদা ওষুধের দোকানে পৌঁছে যাবে। এর মধ্যেই হাওয়ায় একটা সামান্য ভেজা ভেজা ভাব। মেঘ ডাকতে শুরু করেছে।
সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবি  সাদা কালো ২-৪ঠিক যেই মুহূর্তে পদা ওষুধের দোকানে ঢুকলো, ঠিক সেই মুহূর্তে বিকট শব্দে বাজ পরলো আর মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হোলো। পদা ওষুধের দোকানের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ সেই বৃষ্টি উপলব্ধি করলো। পদার গায়ে ছাঁট লাগছে, কিন্তু তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কি আরাম! মাটি থেকে একটা সোঁদা সোঁদা মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে। খানিক বাদে যখন বৃষ্টির প্রবলতা কমলো, তখন পদা দোকানের ভেতর ঢুকল। এ দোকান তার জানাশোনা। নিয়মিত ওষুধ কেনে এখানে। দোকানের মালিক মিত্রবাবু খালি বললেন “খুব বাঁচলাম জানো। আর পারা যাচ্ছিল না। এক সপ্তাহ না দু সপ্তাহের দেবো?” পদা আঙ্গুলের ইঙ্গিতে এক দেখালো। ওষুধ নিয়ে যখন সে দোকান থেকে বেরোলো, তখন সাদা কালো মিলে মিশে আকাশের রঙ ধূসর হয়ে গেছে। অদূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এখনো মেঘ ডাকছে মাঝে সাজে। বৃষ্টি অনেক কমে গেছে। তবে এখনো টিপিটিপি করে পরছে। আজ আর নন্দিতার বাড়ি গিয়ে লাভ নেই। পদা গড়পার রোডের দিকে অগ্রসর হোলো। সে সবে কয়েক পা এগিয়েছে, হঠাৎ পেছন থেকে ডাক এলো “অনীক!” পদা গলার স্বর চিনতে পেরেছে। সে ভাব করলো যেন ডাকটা শোনেনি। এগিয়ে চলল। আবার ডাক “অনীক! দাঁড়াও”। পদা এবারে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো। পেছন ফিরলো না। কয়েক মুহূর্ত পর হাঁপাতে হাঁপাতে এল সোনালি। সে বোধহয় পদাকে ধরার জন্য দৌড়াচ্ছিল। এসে পদার একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ালো। “কি ব্যাপার? তোমাকে কতবার ডাকছি। শুনতে পাও নি?” পদা দেখলো যে সোনালি আজ একটা কালোর ওপর সাদা ফুল কাটা স্কার্ট পরেছে, আর ওপরে একটা ধবধবে সাদা জামা। বৃষ্টির জলে জামাটা কয়েক জায়গায় ভিজে গেছে। “শুনতে পেয়েছি, কিন্তু…” “কিন্তু কি?” পদা এক মুহূর্ত সময় নিল। নন্দিতার কথাটা মনে পড়ে গেল। আই নিড টু মুভ অন। “ফ্রাঙ্কলি স্পিকিং,…” পদা তার বাক্য শেষ করতে পারলো না। সোনালি তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো “কি?” পদা লক্ষ্য করলো যে বৃষ্টিতে সোনালির চোখের পাতাগুলোও সামান্য ভেজা। তার মসৃণ গালে মুক্তোর মত কয়েকটা বৃষ্টির ফোঁটা। “দ্যাট ইউ ডোন্ট গিভ আ ড্যাম? বলেই ফেলো। আমি কিচ্ছু মাইন্ড করবো না”। বলে মুখ নিচু করলো সোনালি। পদা কি বলবে? সে কি করে বোঝাবে যে এই ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং আর রেঠ বাটলারের ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং এক নয়। সে বলতে চেয়েছিল ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং, তুমি কাছে এলেই যে আমার সমস্ত কিছু ওলোট পালোট হয়ে যায়। নিজেকে হারিয়ে ফেলি। তাই তোমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তা আর বলতে পারলো না। সোনালির দিকে তাকিয়ে শেষে বলল “না, তা নয়”। সোনালি কি বুঝলো পদা তা কোনোদিন জানতেও পারবে না। হয়ত পদার ভেতরের আবেগ তার গলার স্বরে ধরা পরেছিল। সোনালি মুখ তুলে সরাসরি পদার চোখের দিকে তাকালো। পদা দেখলো যে এই সোনালি আর সেই চতুর্দশ বয়েসি জেম সিনেমার সোনালি এক নয়। এই সোনালি পরিপূর্ণ যুবতী। এর চাহনিতে একটা মায়া আছে, এর গলার স্বরে একটা আত্মবিশ্বাস আছে। এত বছরে পদার অজান্তে তারও হয়ত খানিকটা আত্মবিশ্বাস জন্মেছে। এবার সে আর চোখ সরালো না। সোনালি মিষ্টি করে হাসল। তারপর পদার হাতটা নিজের নরম হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল “চলো। আমরা একটু হাঁটি”। দক্ষিণ আকাশে তখন তুলোর মত ধবধবে সাদা কয়েকটা নতুন মেঘ এসে হাজির হয়েছে। পড়ন্ত সূর্যের রক্তিম আলো ঠিকরে পরছে তাদের গায়ে।
।সমাপ্ত।

ছবির সংরচনা ড্যাল-ই-এর মাধ্যমে এবং প্রোক্রিয়েট দিয়ে স্কেচ করেছেন সৌরভ রায়চৌধুরী

আরো পড়ুনসাদা কালো – ২য় পর্ব

সাদা কালো – ১ম পর্ব

সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবি

শুকিয়া স্ট্রিট আর সার্কুলার রোডের মোরে স্কুল ফেরতা ঘুগনি খাচ্ছিলো পদা। ঘুগনি ওয়ালার সাথে একটা ছোটখাট বচসাও চলছিল ঝাল কম দিয়েছে বলে। এরি মধ্যে হঠাৎ কাঁধে টোকা। ঘুরে দ্যাখে বাবলু দা। বাবা বলেছে “বাবলুর সাথে তোকে যেন খবরদার না দেখি। ও ব্যাটা ছোটলোক”। কি করে যে বাবা লোক দেখেই ভদ্রলোক আর ছোটলোক বুঝে যায়, পদা সেটা অনেক চেষ্টা করেও ঠিক আয়ত্ত করতে পারে নি। কিন্তু বাবলু দা যেন চুম্বক। পদা চেষ্টা করেও এড়াতে পারে না। চেহারা টা অনেকটা মিনি মিঠুন চক্রবর্তী। বাবরি চুল। বিশাল ঘের ওয়ালা বেল বটম প্যান্ট। গায়ে স্কিন টাইট স্যান্ডো গেঞ্জির মত জামা। চোখে সানগ্লাস। গালের চামড়া পুরো মাখন। খালি হাইট টা একটু কম মিঠুনের থেকে। পদা দেখে আর ভাবে “ইশ, বাইসেপ গুলো যদি বাবলুদার অর্ধেকও হতো, স্কুলের ওই মিষ্টি দুই বেনিওয়ালা রতি বলে মেয়েটা, রতি অগ্নিহতৃর মত গলায় ঝুলতো”! “কিরে এই মাত্র ফিরলি? তোর জন্য সোয়া চারটে থেকে অপেক্ষা করছি”। দোষের মধ্যে বাবলুদার ওই একটাই। স এর দোষ। “হ্যাঁ বাস পেলাম না। হেঁটে ফিরলাম”। “যাকগে সোন, যে জন্য তোকে দরকার, তোদের পাসের বাড়ির ওই মেয়েটার নাম কি রে?” “কোন মেয়েটা?” “আরে ওই যে রে, যেই মেয়েটা রোজ বিকেল বেলা ছাদে কুকুর নিয়ে ঘুরে বেড়ায়!” “কে? সোনালি?” “সোনালি? ওর নাম সোনালি?” “হ্যাঁ, কিন্তু ও তো সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবিক্লাস নাইন এ পরে। তোমার থেকে তো অনেক ছোট!” “ভাগ সালা! ছোট তো কি আছে? ছোটই তো ভাল। বেস নিজের হাতে গড়ে নেবো”। পদা কথা ঘোরাতে চায়। আসলে সোনালি কে তার নিজেরই একটু পছন্দ, যদিও সোনালি ওর থেকে এক বছরের বড়। কথা ঘুরিয়ে বলে “আচ্ছা বাবলুদা, কাল আমাকে জিম এ নিয়ে যাবে তো?” “ধুর! তুই ওসব করে কি করবি? তোর কি এখনো বয়েস হয়েছে নাকি মেয়ে পটানোর? তার থেকে বরং চল, কাল আমার সাথে একটা ইংরিজি সিনেমা দেখতে চল”। “ইংরিজি সিনেমা?” “কেন? বাবা বকবে? আরে, তোর বাবা তো আমার সাথে তোকে দেখলেই বকবে। ইংরিজি সিনেমা দেখিস কি না দেখিস, তাতে কি কিছু এসে যাবে?” কথাটা বাবলুদা ভুল বলেনি। এই জন্যই বাবলুদাকে এত ভাল লাগে। মাথাটা ওর পরিষ্কার। রাজী হয়ে গেল পদা।

পরদিন রবিবার। দুপুরবেলা বই খাতা ব্যাগে ভরে বেরোতে বেরোতে মাকে হাঁক দিলো “মা, আমি বুম্বাদের বাড়ি যাচ্ছি। অনেক হোমওয়ার্ক”। মা উত্তর দেওয়ার আগেই পদা দরজার বাইরে। শরীরে বেশ একটা রোমাঞ্চ হচ্ছে। জীবনের প্রথম ইংরিজি সিনেমা! বাবলুদা বলে রেখেছে পদা যেন জেম সিনেমার সামনে ঠিক দুটোর সময় অপেক্ষা করে। পদা এক কথায় রাজি। সে জেম সিনেমা চেনে। স্কুল কেটে একবার জেম এ শোলে দেখেছে। 30B বাসে চেপে মৌলালির মোর ছাড়ানোর পর একটা স্টপ। ম্যানেজ হয়ে যাবে ঠিকই। দুটোর একটু আগেই পৌঁছে গেল পদা। সিনেমা হলের সামনেটা লোকে লোকারণ্য। বাবলুদাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। “টিকিট কেটে রেখেছে তো! যা ভিড়!” মনে মনে ভাবে পদা। হঠাৎ নজরে পরে বাবলুদাকে। একটা জটলার মধ্যে ধস্তাধস্তি করছে। পরনে মেরুন রঙের গ্যাবারডিনের প্যান্ট আর একটা বেগুনি আর সাদা চক্কর বক্কর জামা। “বাবলুদা!” বাবলুদা ঘাড় ঘোরালো। ভিড়ের মধ্যে নিজের লাইনটা সামলে হাতের ইশারায় পদাকে কাছে ডাকল। “কিরে, এত দেরি?” “তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না”। “খুঁজে পাচ্ছিলিস না মানে? এখানেই তো ছিলাম। যাকগে, চারটে টাকা দে”। “চার টাকা?” “যা সালা! বিনা পয়সায় সিনেমা দেখবি নাকি? পয়সা আনিস নি?” “হ্যাঁ কিন্তু…” “ঠিক আছে, যা আছে দে” পদা ব্যাজার মুখে তার সবেধন নিলমনি আড়াই টাকা বাড়িয়ে দেয়। হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে। অন্যমনস্কভাবে পদা এইসব ভাবছে, হঠাৎ বাবলুদার আবির্ভাব। তার হাতে গোলাপি টিকিট। “চল। ও ওইদিকটায় দাঁড়িয়ে আছে”। “কে?” বাবলুদা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে চলেছে। পদা তার পেছন পেছন। একটু পিছিয়ে পরেছে সে। অদূরে মেরুন শাড়ি পরা এক মহিলা। বাবলুদা তাকে কিছু একটা বলল। মহিলা ঘুরল। বাবলুদার কনুই ধরে এগিয়ে আসছে। পদা ভিড়ের মধ্যে তাল সামলে যখন মুখ তুলল, তার সামনে তখন সোনালি!

সোনালি!একি সেই একই সোনালি? সকাল বিকেল যাকে পদা দেখেছে পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতে, বারান্দায় জামা কাপড় শুকো দিতে, কুকুর নিয়ে ছাদে ঘুরতে? একি সেই সোনালি যাকে রাস্তার মোরে ওর ভাই এর সাথে দাঁড়িয়ে মাঝে সাজেই ফুচকা খেতে দেখা যায়? ভাল লাগতো আগে ঠিকই, কিন্তু এ তো সাক্ষাৎ পরি! কি করে পদা একে আগে দেখেনি? শারী পরলেই মেয়েদের এত ডাগর ডগর দেখায়? হাজার প্রশ্নের এই ঝর সামলাতে পদা যখন জুঝছে, তার সমস্ত সুবাস নিয়ে এগিয়ে এলো সোনালি। মিষ্টি হেসে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে বলল “হ্যালো অনীক, তোমাকে সব সময় দেখি, কিন্তু কথা বলার সুযোগ হয় নি”। অনীক! এ নামে পদাকে সচরাচর কেউ ডাকেনা। শুনে পদার খুব ভাল লাগলো। “সত্যি? তুমি আমাকে দ্যাখো?” বলতে চাইলো পদা, কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হল না। তার ভীষণ আক্ষেপ হতে লাগল যে সে আজ সেজে গুজে আসেনি। কি করে জানবে যে বাবলুদা এই রকম একটা কান্ড করে বসবে! কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ তুলে একটু হেসে সোনালির হাতে হাত ঠেকিয়ে বলল “হ্যালো”! ইতিমধ্যে বাবলুদা কোথায় একটা হাওয়া হয়ে গিয়েছিলো। হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলো। দু হাতে দুটো চকলেট আইসক্রিম। “কি ব্যাপার? মুখটা ওরকম মেনি বেড়াল মার্কা করেছিস কেন?” বলে একটা আইসক্রিম সোনালি আর অন্যটা পদার দিকে এগিয়ে দিল। “আমি খাব না” পদার গলাটা এবারে একটু পরিষ্কার হয়েছে। “কি ন্যাকা মাইরি তুই। আইসক্রিম আবার কেউ না করে নাকি?” সোনালিও না বলতে যাচ্ছিল। বাবলুদার কথা শুনে একটু থমকে গেল। সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবিতারপর তার গোলাপি জিভ বার করে ধীরে ধীরে আইসক্রিম চাটতে শুরু করলো। অতি সাবধানে, যাতে লিপ্সটিকের ক্ষতি না হয়। পদা হাঁ করে খানিকক্ষণ দেখলো। উফ! শরীরটায় একটা অদ্ভুত কিচুলি বিচুলি ভাব হচ্ছে। পদা বিভ্রান্ত! শেষে চোখ সরিয়ে নিয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল। “চলো, আমার হয়ে গেছে”। সোনালির গলার স্বরে পদার ঘোর কাটলো। তিনজনে সিনেমা হলের গেটের দিকে এগোতে শুরু করলো। বাবলুদা পকেট থেকে চিরুনি বার করে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলল “কিরে, সিনেমায় যাচ্ছিস, সিনেমার নামই তো জানিস না?” “তুমি তো বললে না”। সোনালি একটু আগে যাচ্ছে। সোনালির গায়ে যাতে কারো ছোঁয়া না লাগে তার জন্য বাবলুদা তার দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে সোনালির ঠিক পেছন পেছন তাকে আগলে চলেছে। পাশে পদা। “গন উইথ দা উইন্ড। ঘ্যামা বই। ড্রামা আছে, ফাইটিং আছে, যুদ্ধ আছে। সব পাবি”। তারপর পদার কানের কাছে মুখটা এনে বলল “আর পোচুর ঢলানি আছে। ওই জন্যই তো ওকে নিয়ে এলাম”। বলে মুচকি হাসল। “তা আমাকে আসতে বললে কেন?” “তুই না এলে যে ও আসতো না” পদার মুহূর্তের জন্য কথাটা ভাল লাগল, কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝে নিল ব্যাপারটা। সাময়িক রাগ হলেও মনে মনে মানতে বাধ্য হল যে বাবলুদার জন্যই সোনালির সাথে তার পরিচয়টা আজ হল।

ইতিমধ্যে ওরা হলে প্রবেশ করেছে। সারে তিন টাকার টিকিটের পুরো সেকশনটাতে মাত্র একজন সিট দেখিয়ে দেবার লোক। তাকে ঘিরে ধরেছে জনা শয়েক টিকিটধারী। বাবলুদা বলল “তুই ওর কাছে কাছে থাকতো!” বলে “এইযে দাদা…” হাঁক পেড়ে ঝাঁপিয়ে পরলো ভিড়ে। মিনিট খানেকের মধ্যে ফিরে এল টিকিট চেকারকে বগলদাবা করে। ভদ্রলোক মিনমিনে কণ্ঠস্বরে কি যেন বললেন বাবলুদাকে। শোনামাত্র পদা আর সোনালির হাত ধরে বাবলুদা হুকুম করলো “চলে আয়। আমি জানি কোথায় সিট”। অন্ধকারে অন্যান্য লোকের পা মারিয়ে হোঁচট খেতে খেতে হঠাৎ পদা আবিষ্কার করলো যে সে তার সিটে বসে পরেছে। পাশে বাবলুদা। বাবলুদার ওপাশে সোনালি। ঠিক যেন ম্যাজিক! শান্ত হবার পর ভাবলো একবার বাবলুদাকে বলে “কেন? সোনালিকে মাঝে বসাতে পারো তো? ও তো আমার জন্যই এসেছে!” কিন্তু মনের কথা মনেই রয়ে গেল।

তবে বিধাতা বোধহয় আজ পদার জন্য অন্য পরিকল্পনা করেছেন। সিনেমা শুরু হবার আগে আডভাটিস্মেন্ট চলছে। তার শব্দে ওপাশে বাবলুদা আর সোনালি ফিশফিশ করে কি খুনশুটি করছে তা কান খাড়া রেখেও পদা শুনতে পাচ্ছে না। তার ভীষণ রাগ হচ্ছে। কি ভাবে ওদের আলাপে ব্যাঘাত ঘটাবে সেই চিন্তায় পদা যখন ব্যস্ত, তখন হঠাৎ বাবলুদা তিড়িং করে উঠে দাঁড়ালো। তারপর সোনালিকে টপকে ঝুঁকে পরে পাশের ভদ্রলোকের কলার ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে গর্জে উঠলো “এই যে দাদু, বাড়িতে কি বাতি জ্বলে না? সিনেমা হলে এসব কি করছেন? বার করে দেবো?” তারপর কলার ছেড়ে দিয়ে সোনালিকে মৃদু কণ্ঠে বলল “তুমি মাঝখানে বসো”। “ভগবান, তুমি সত্যিই আছো!” ভাবে পদা। মুহূর্তের মধ্যে একটা মিষ্টি গন্ধে ছেয়ে গেল পরিবেশ।

সেই সুগন্ধের নেশায় তলিয়ে গেল পদা। কখন যে সিনেমা শুরু হল, কে যে সেই সিনেমার নায়ক নায়িকা, কি যে সেই সিনেমার কাহিনি, কিছুই পদাকে প্রথম দশ পনেরো মিনিট আর ছুঁলো না। কপালে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে শুধু বুক ভরে গভীর ঘ্রাণ নেয় আর আড়চোখে চুরি করে দেখে। এমনিভাবে কতক্ষণ কাটে পদার খেয়াল নেই। এক সময় সে লক্ষ করলো যে যে ভদ্রলোক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করছে তার প্রতি সোনালির অপলক আকর্ষণ। লোকটাকে দেখতে খারাপ নয়, তবে চেহারাটা কেমন যেন একটু ষন্ডা মার্কা। একে এত ভালো লাগার কি আছে? তবে মানতেই হবে, ভদ্রলোকের গলাখানা খাশা। সত্যিকারের ম্যানলি যাকে বলে। ইন্টারভেলে বেরিয়ে চট করে পোস্টারে দেখে নিল যে লোকটার নাম রেঠ বাটলার আর তার ভূমিকায় অভিনয় করছে ক্লার্ক গেবেল। মনে রাখতে হবে। সিনেমা চলতে থাকে। বাবলুদা ঠিকই বলেছে। প্রচুর ঢলানি। চুমুর পর চুমু। এরা এত চুমু খায় কেন? ভাবে পদা। একটা খেলেই তো বরং ভাল হতো। কে জানে? সোনালিকে আড়চোখে দেখে একবার। ওর ঠোঁট দুটো বেদানার মত। ওকে চুমু খেলে কেমন হবে? মনে মনে লজ্জা পায় পদা। কান গরম হয়ে যায় তার। শেষে যখন রেঠ বাটলার নায়িকাকে বলল “ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং ডিয়ার, আই ডোন্ট গিভ এ ড্যাম…” তখন দেখলো সোনালির চোখ দুটো চিকচিক করছে। খুব কষ্ট হয়েছিল তখন পদার। মনে হচ্ছিল ওকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

সিনেমা শেষ। ওরা বেরিয়ে এল হল থেকে। বাইরে প্রচণ্ড রোদ আর নতুন শোতে ঢোকবার জন্য লোকের ভীড়। “এই তোরা একটু দাঁড়া। আমি একটু বাথরুম থেকে আসছি,” বলে বাবলুদা হাওয়া। ওরা দুজনে দাঁড়িয়ে রইল। ভিড়ে জায়গা কম। সোনালির আঁচলটা পদার বুকে ঠেকছে। আবার সেই নেশা ধরানো সুবাস। সোনালির নিঃশ্বাসের ছোঁয়া লাগছে তার গলায়। পদা চোখ বুজে শুধু অনুভব করছে। চোখ খুললেই ওর হাঁটু দুটো কেমন যেন দুর্বল লাগছে। সোনালি যে বড্ড কাছে! এইভাবে কতক্ষণ ওরা দাঁড়িয়েছিলো পদা জানে না। হঠাৎ অনুভব করলো যে তার হাতে আর একটা হাত। নরম তুলতুলে। সোনালির হাত। হয়ত ভুল করে নিজের অজান্তেই সোনালির হাত ধরে ফেলেছে সে। ছিঃ ছিঃ! কি লজ্জা! হাত সরিয়ে নেবার আগেই সোনালির হাতের মুঠো দৃঢ় হলো। পদার দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখে চোখ রেখে সে বলল “মাসিমা সেদিন মা কে বলছিলেন যে তুমি নাকি দারুণ মাউথ অরগান বাজাও। আমাকে শোনাবে একদিন অনীক?”

বেশ কিছুদিন যাবত পদার একদম ঘুম হচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু ঘুরেফিরে ঘুমের মধ্যে সেই সিনেমার নায়িকা আর সোনালির মুখটা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মুখ দেখা দেয়। এমন একমুখ যার চোখে কোনো ভাসা নেই, কিন্তু ঠোঁটের কোনে এক বক্র হাসি। যেন পদাকে ব্যঙ্গ করছে। সেদিনের সেই সিনেমা হলের সোনালির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেদিন সিনেমা থেকে তিনজনে ফিরেছিল ট্রামে করে। পদা আর সোনালি সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবিপাশাপাশি বসেছিল। সোনালি আর কোনো কথা বলেনি বিশেষ। হয়ত পদা কিছু বলবে সেই অপেক্ষায় ছিল। আর পদা? সে কথা বলতে চেয়েছিল। অনেক কথা। অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু তার হৃৎপিণ্ড এত জোরে দৌড়াচ্ছিল যে সে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। পাছে বেফাঁস কিছু বলে ভাল লাগার আবেশটাকে নষ্ট করে দেয়। তাছাড়া বাবলুদার সামনে সে কিই বা বলবে? পুরো রাস্তা বাবলুদা এন্তার বকবক করে গেল। বেশির ভাগটাই সোনালিকে উদ্দেশ্য করে। পদা লক্ষ্য করেছে সোনালি ভাল করে বাবলুদার কথা শুনছিল না। তার দৃষ্টি ছিল দূরে, অন্যমনস্ক। ট্রাম থেকে শুকিয়া স্ট্রিটের মোড়ে নেমে, বাবলুদা আর রাস্তা পার হলো না। পদাকে একপাশে টেনে কানে কানে বলল “ওকে তুই একটু বাড়ি যাওয়ার পথে ছেড়ে দে তো! ওর মা আমাকে দেখলে আবার ক্যাঁচাল করবে”। পদা খুশি হয়েছিল। অন্তত কয়েকটা মিনিট সোনালির সান্নিধ্যটা একা পাওয়া যাবে। সার্কুলার রোড পার হয়ে দুজনে রামমোহন রায় রোড ধরে হাঁটতে লাগলো। ফেব্রুয়ারি মাস, কিন্তু পদার কপালে ঘাম। সে আড় চোখে একবার সোনালিকে দেখলো। সোনালি মাথা নীচু করে দ্রুতপদে হেঁটে চলেছে। পদা খুব চাইছিল যে সোনালি আরও কিছু বলুক। কিন্তু সোনালি তার ধারে কাছ দিয়ে যায়নি। কেবল নিজের বাড়ির ভেতর ঢুকে যাওয়ার আগে হাত নেড়ে পদাকে “বাই” বলেছিল।

কেন ও আর কিছু বলল না? পদা কি কিছু দোষ করে ফেলেছে? কিন্তু কই? সেরকম তো কিছু মনে পরছে না! পদা তো কোন কথাই বলে নি। তাহলে দোষই বা হবে কি ভাবে? তবে কি সেটাই পদার ভুল? তার কি নিজে থেকে কিছু বলা উচিত ছিল? সোনালিই বা এত চুপচাপ ছিল কেন? হয়ত বা চিন্তিত ছিল বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে বলে। সিনেমাটা তো বেশ লম্বা ছিল; হিন্দি সিনেমার থেকেও বড়। মাকে হয়ত বলে এসেছিল যে ছটার আগে ফিরবে। কোন বান্ধবীকে হয়ত বলে রেখেছিল যে মা জিজ্ঞেস করলে বলবি যে ছটা অব্ধি তোর বাড়িতে ছিলাম। হয়ত বা সে চায়নি যে পাড়ার লোকে দেখুক যে সে পদার সাথে সন্ধেবেলা কোথাও থেকে ফিরছে। কেন? কেন? কেন? এই সমস্ত ভেবে ভেবে পদা প্রতি রাতে খালি এপাশ ওপাশ করে। ভোরের দিকে ক্লান্ত চোখে যখন ঘুম নামে, তখন আবির্ভাব হয় সেই মুখের। কি যে করবে ভেবে কূল কিনারা পায় না পদা। জীবনটার হঠাৎ এ কি হল? দিব্বি তো ছিল!

এই ভাবে কয়েক মাস কেটে গেল। ঘুমের সেই একই দশা। না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শরীরটা সব সময় ক্লান্ত লাগে। চোখের কোলে কালি। মা বারবার জিজ্ঞেস করে “তোর কি হয়েছে?” পদা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে মার চোখ এড়িয়ে যায়; বলে “কই, কিছু না তো”। এদিকে সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। পড়াশুনা তো লাটে উঠেছে। এতকাল পদা খুব ভাল রেজাল্ট করে এসেছে। পরীক্ষায় খারাপ হলে নির্ঘাত ধরা পরে যাবে মা’র কাছে। আর বাবা তো চটে তেলেবেগুনে হয়ে যাবে। রেজাল্ট ভাল করে বলে বাবা পদাকে বিশেষ ঘাঁটায় না। কিন্তু এবারে কি হবে? কারো সাথে যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করবে তারও উপায় নেই।

সোনালিকেও আজকাল আর বিশেষ দেখা যায় না। আগে মোটামুটি প্রতিদিন বিকেলবেলা দেখা যেতো সোনালি ওর কুকুর নিয়ে ছাদে খেলা করছে বা পায়চারি করছে। ঘটনার পর প্রথম প্রথম পদা ছাদে উঠে খুব মাউথ অরগান বাজাতো। ভেবেছিল কৃষ্ণের বাঁশির মত তার মাউথ অরগান রাধাকে কাছে এনে দেবে। বাঁশি অনেকদিন বাজলো, কিন্তু রাধা এলো না। এখন আর পদা মাউথ অরগান বাজায় না। কি লাভ? মাসিমা, অর্থাৎ সোনালির মা, মাঝে সাজে ওদের বাড়িতে আসে মা’র সাথে গল্প করতে। পদা আড়ি পেতে ওদের কথা শোনে, যদি সোনালি সংক্রান্ত কোন খবর পাওয়া যায়। কিন্তু কোন উল্লেখযোগ্য খবর এই ভাবে সে উদ্ধার করতে পারেনি। এরই মধ্যে এক ছুটির দিন পদা বেরিয়ে সারকুলার রোডের দিকে যাচ্ছিলো, হঠাৎ তার নজরে পরলো সোনালি উলটো দিক থেকে আসছে। তার পরনে একটা সাদা আর কালো মেশানো সালওয়ার কামিজ। আরো সুন্দরী হয়েছে। পদার হৃৎপিণ্ড যেন ধাক্কা মেরে ওকে ফেলে দেবে। কোনোরকমে সে এগিয়ে চলল। ঠিক যেই মুহূর্তে পদা আর সোনালি একে অপরকে পার হবে, সে মুহূর্তে সোনালি তার গভীর চোখ তুলে চাইলো। পদাকে হঠাৎ সামনে দেখে একটু হকচকিয়ে গেল। কিন্তু পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হেসে বলল “ভাল আছো তো অনীক?” কতকাল পরে পদা আবার সেই কণ্ঠস্বর শুনলো! আবার অনীক! পদা কি উত্তর দেবে ভাবছে, কিন্তু উত্তর দেবার আগেই দেখলো সোনালি তাকে পার হয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। একবার ভাবল পেছন থেকে ডাকে; ডেকে বলে “সোনালি তুমি যে আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছো গো, ভাল কি করে থাকবো বল?” কিন্তু এ কথা যে কাউকে বলার নয়; সোনালিকেও নয়।

এমনি করে দেখতে দেখতে দু বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল। বাবলুদাকে আজকাল আর এ পাড়ায় দেখা যায় না। গত বছর পুজোর সময় একবার প্যান্ডেলে দেখা হয়েছিল। বলল যে ও নাকি এখন বজবজ লাইনে ট্রেনে হকার। ওর মা এ চত্বরে থাকে বলে পুজোতে এসেছে। সোনালির কথা ও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। পদাও কোন উচ্চবাচ্চ্য করেনি। বাবলুদাকে দেখে পদার ওই দিন খুব ভাল লেগেছিল। বাবা যাই বলুক, ছেলেটার মনটা খুব বড়। পদা এখন ক্লাস টেন এ পরে। প্রায় ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা। ছিপছিপে সুন্দর চেহারা। স্কুলের অনেক মেয়েরাই এখন পদার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু পদার তাতে কোনো উৎসাহ নেই। সে পড়াশুনা করে খুব মন দিয়ে। ক্লাস এইটের রেজাল্ট টা খারাপ হবার পর পদা খানিকটা সামলে নিয়েছে। ঘুম এখনো তার কম হয়, তবে সেই মুখ স্বপ্নে আর দেখা দেয় না। সোনালি কিন্তু এখনও মনের আনাচে কানাচে ঘোরে। মাঝে মধ্যে তার সাথে রাস্তাঘাটে দেখাও হয়ে যায়। তবে সে দেখা আর পাঁচটা মেয়ের সাথে রাস্তায় দেখা হওয়ার মতই। জেম সিনেমার সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তটা আজ যেন কত দূরে। মাঝে মাঝে পদা ভাবে সত্যই কি সেই ঘটনা ঘটেছিল? নাকি তার মনের ভুল? সত্যি হোক বা না হোক পদার এখন বোঝবার বয়েস হয়েছে যে সোনালি হয়ত কিছু না ভেবেই কথার কথায় তাকে একদিন মাউথ অরগান শোনাতে বলেছিল। তারপর যে ব্যাপারটা আর এগোয়নি তার জন্য সে আর সোনালিকে দায়ী করে না। আর করবেই বা কোন অধিকারে?

“অনেক রাত হয়েছে বাবা, এবারে শুয়ে পর,” ঘরে এসে উঁকি দিল মা। রাত এখন একটা। সামনের মাস থেকে পদার মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু। সে অনেক রাত জেগে পড়ে। রাত জাগার যে খুব প্রয়োজন তা নয়। আসলে পদার রাত জাগতে ভাল লাগে। গোটা শহরটা যখন ঘুমিয়ে পরে, তখন রাতের আকাশটাকে কেমন যেন মায়াবী লাগে। তারাগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় যেন ওরা কিছু বলতে চায়। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পদা মাঝে মাঝে ছাদে চলে যায়। খোলা আকাশের নিচে পায়চারি করতে করতে তার সদ্যঃপ্রাপ্ত ভরাট গলায় গায় “আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, এই আকাশে…” পদার গানের গলা খুব সুন্দর, যদিও সে কারো সামনে কখনো গান গায় না। মাঝেমাঝে পায়চারি থামিয়ে সোনালিদের বাড়ির দিকের ছাদের কোনটায় দাঁড়ায়। অন্যমনস্ক হয়ে যায়। সোনালি কি এখন…? নিজেকে জোর করে থামায়। অবশ্য রাত জাগার আরো একটা কারণ আছে পদার। ইদানীং পদা মাঝেমধ্যে এক আধটা সিগারেট খায়। মা শুয়ে পরার আগে খাওয়া যায় না। কেন যে খায় সে নিজেই জানে না, তবে লক্ষ্য করেছে যে খেলে মন্দ লাগে না। “তুমি শুয়ে পরো মা, আমি আর আধ ঘণ্টায় শুয়ে পরবো”। মা চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকলো। পদার কাঁধে হাত রেখে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যেন হঠাৎ মনে পরেছে সেইভাবে বলল “হ্যাঁরে, পাশের বাড়ির মানুদি বলছিলেন যে সোনালি নাকি সামনের বছর থেকে সেন্ট জেভিয়ার্স এ কমার্স পরবে”। পদা অবাক হলো। মা হঠাৎ এই কথাটা কেন এত রাতে বলতে এলো? তাহলে কি মা কিছু আঁচ করেছে? কিন্তু আঁচ করবেই বা কি করে? পুরোটাই তো পদার মনের কল্পনা। কে জানে? হয়ত বা মায়েরা নিজেদের সন্তানের কল্পনাটারও হদিস পেয়ে যায়। পদা অবিশ্যি জানে যে সোনালি এক বছর ড্রপ দিয়েছে। কেন তা জানেনা। খবরটা শুনে সে খুশিই হলো। যদিও তার বয়স মোটে ষোলো, তবু এই গত দু বছরে পদা খুব ভালো করেই বুঝে গেছে যে মস্তিষ্কটাকে কাজে ব্যস্ত রাখাটা খুব জরুরি। তাতে মনের কষ্ট কমে। মাকে সে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো “তুমি খুব ভালো, মা। যাও শুয়ে পরো। আমি এক্ষুনি শুয়ে পরবো”।

মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোল। পদা স্টার পেলো। সে যে পরিমাণ খেটেছিল, তাতে অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদিও তার স্কুলে সে প্রথম স্থান পায়নি, তবুও তার রেজাল্ট উল্লেখযোগ্যই বলা চলে। অঙ্কে সে স্কুলের সকলের চেয়ে বেশী নম্বর পেয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সে সায়েন্স নিয়েই পড়াশোনা করবে। ইলেভেন টুয়েলভ কোন স্কুলে পরবে সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। পদার ইচ্ছা কোনো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ঢোকার। ইংরিজি সে ভালোই জানে, তবে বলতে গেলে একটু জড়তা। সে জানে যে আজকাল ইংরিজি ভাল করে জানাটা চাকরি বাকরির ক্ষেত্রে আবশ্যক। পদা ঠিক করলো যে বাবার কাছে কথাটা পাড়বে। রেজাল্ট ভালো হওয়াতে বাবার মেজাজ এখন ফুরফুরে। একদিন সুযোগ বুঝে বলল “বাবা, আমি ভাবছি স্কুল চেঞ্জ করবো”। বাবা রাগ করলেন না। ভাল লক্ষণ। “কেন রে?” “না মানে আমাদের স্কুলের সব স্ট্যান্ড করা ছেলেমেয়েরা তো অন্যান্য আরো ভালো স্কুলে চলে যাচ্ছে, তাই”। “তা, কোথায় পড়বি ভাবছিস?” “সেন্ট জেভিয়ার্স”। বাবা এবারে গম্ভীর। “না না, ওটা তো স্কুল নয়, ওটা কলেজ। ওখানে ছেলেপিলেরা খুব তাড়াতাড়ি বখে যায়। যত ট্যাঁশ দের আড্ডা ওখানে”। “কিন্তু বাবা, পাশের বাড়ির…” বলতে গিয়েও পদা থেমে গেলো। এ কি বলতে যাচ্ছিলো সে! “তাহলে আমি কি করবো?” “কেন? ভাল স্কুলে পরতে চাস, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি হয়ে যা। হোস্টেলে থাকলে স্বাবলম্বী হওয়াটাও শিখবি”। “কিন্তু আমি যে ভেবেছিলাম ইংলিশ মিডিয়ামে…” “আরে ধুর! ইংরিজি শেখার বয়েস কি পেরিয়ে যাচ্ছে নাকি? কলেজে যখন পড়বি এমনিতেই ইংরিজি শিখে যাবি”। পদা আর কিছু বলল না। বাবার সাথে তর্ক করে লাভ নেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলো। সঙ্গে তার একরাশ চিন্তা। অনেকটা হাঁটলো। অবশেষে হেদুয়ার পাশে একটা বেঞ্চে শান্ত হয়ে বসলো। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াটা মন্দ হবে না। আর কথাটা বাবা ভুল বলেনি। ইংরিজি সে ঠিকই শিখে যাবে। নিজেকে বোঝালো যে যে কারণে সে সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়তে চাইছিল সেই কারণটা তো পুরোপুরিই তার মনগড়া, কল্পনার শিশিরে মোড়া। রোদ উঠলেই সব উবে যাবে। সময় এসেছে হয়ত সেই কল্পনার বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়ার। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে—এই পাড়া থেকে দূরে সরে যাওয়াটাই এখন কাম্য। মা অবিশ্যি মন খারাপ করবে। পদারও মা’র জন্য মন খারাপ লাগবে। তবে বাড়িতে তো মাঝেমাঝেই আসবে। এ তো দিল্লি বোম্বাই নয়। অনেকদিন পরে পদার নিজেকে কেমন যেন হঠাৎ স্বাধীন লাগছে। হেদুয়ার জলে ভেসে বেরানো হাঁসগুলোকে সে অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখলো। “আমি তোদের মত হতে চাই; সম্পূর্ণ বাঁধনছাড়া”। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঞ্চ থেকে উঠলো। বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালো। “আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…” মনে মনে গুনগুন করছে সে। আকাশের রংটা আজ গাঢ় নীল। মেঘের লেশমাত্র নেই তাতে।

নরেন্দ্রপুর পদার ভীষণ ভালো লাগছে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাড়ির জন্য খুব মন খারাপ করতো। সব কিছুর অভাব বোধ করতো, বিশেষত মায়ের গন্ধ আর মায়ের হাতের রান্না। এখন তা সয়ে গেছে। এখানকার খাবার দাবার ভালোই বলতে হবে। বাড়ির মত না, তবে বেশ ভাল। কিছু কিছু রান্না—যেমন খিচুড়ি—বাড়ির থেকেও বেশী মুখরোচক লাগে পদার। আস্তে আস্তে অনেকের সাথে বেশ বন্ধুত্বও হচ্ছে। সবাই খুব মেধাবী। তবে সবাই যে বন্ধুত্ব পাতাবার উপযোগী তা নয়। জনা তিনেক খুব ভালো বন্ধু হয়েছে পদার এই আট মাসে। ক্যাম্পাসের পরিবেশটা ভারী ভালো লাগে পদার। এক ফোঁটা নোংরা নেই। রোজ খুব ভোরে ওঠে সে। উঠে ঘণ্টাখানেক ব্যাম করে। বিকেল বেলা ফুটবলও খেলে। তার শরীর এখনও খুব মজবুত। চেহারা আগেই ভাল ছিল, এখন মাথা ঘুরিয়ে দেখার মত। তবে গলার স্বরটা এখনো ক্লার্ক গেবেলের মত হয়নি। মনে হয়না কোনোদিন আর হবে। আজকাল সে আবার মাউথ অরগান বাজাতে শুরু করেছে। নরেন্দ্রপুরের সব থেকে ভালো যেটা পদার লাগে সেটা হলো পড়াশুনার আবহাওয়াটা। শিক্ষকরা খুব যত্ন নিয়ে পড়ান। আর কত কিছু শেখান; জীবন সম্পর্কে, এই জগৎ সম্পর্কে। পদা মাঝেমাঝেই বাবাকে এই জন্য মনেমনে ধন্যবাদ জানায়।

রবিবার দুপুরবেলা পদা নিজের ঘরে দিবানিদ্রা দিচ্ছিল। এই সপ্তাহে সে বাড়ি যায়নি। সামনের সপ্তাহে স্কুলে বড় একটা অনুষ্ঠান আছে বলে। এর মধ্যে তার বন্ধু রাজু এসে ঘুম ভাঙালো “এই অনীক, ওঠ, মহারাজ তোকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তোর খোঁজ করছেন একজন”। “কে?” “একজন অল্প বয়সী মহিলা”। “কি নাম বললেন মহারাজ?” পদা জিজ্ঞেস করলো। রাজু নাম জানে না। পদার ভুরু কুঁচকে গেল। “অল্প বয়েসি মহিলা। কে হতে পারে? তবে কি…”। পরমুহূর্তেই সে নিজেকে থামায়। নিজেকে বোঝালো “তা কেন হতে যাবে?” আর তাছাড়া লিগাল গার্জেন ছাড়া কারো যখন খুশি দেখা করার নিয়ম নেই। যাইহোক, রহস্যটা রয়েই গেল। হৃৎপিণ্ডটা কি বেশি ধুকপুক করছে? তাড়াহুড়ো করে একটা জামা চড়িয়ে নিচে নেমে এলো সে। ভিজিটর রুমের দিকে হাঁটা লাগালো। ঘরে ঢুকে দেখলো সত্যি সত্যিই একজন মহিলা তার জন্য অপেক্ষা করছে। পদার পায়ের শব্দে সে ঘুরলো। অচেনা। পদা তাকে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ছে না। বয়স অল্পই। সিঁথিতে সিঁদুর। পদা কিছু বলার আগেই ভদ্রমহিলা গলা অত্যন্ত নামিয়ে বললেন “আপনি কি অনীক রায়চৌধুরী?” “হ্যাঁ”। “গড়পাড়ের পদা?” “হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে…”। “আমাকে আপনি চিনবেন না। আমার নাম মাধবী। কিছু মনে করবেন না, ওনাদের আমি বলেছি যে আমি আপনার জ্যাঠতুতো দিদি আর আপনার জ্যাঠার শরীর খুব খারাপ”। পদা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো। কিছু বলতে পারলো না। তার একমাত্র জ্যাঠা বহুকাল আগে পরলোকগত। মহিলা আবার বলল “আপনি বাবলুদাকে চেনেন তো?” “বাবলুদা?” “হ্যাঁ বাবলুদা। আপনাদের পাড়ায় আগে থাকতো”। “আমাকে প্লিস আপনি বলবেন না। হ্যাঁ চিনি বইকি। কিন্তু বাবলুদার কথা আপনি বলছেন কেন?” “ওঁ আমার স্বামী”। পদা আবার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। সেই সিনেমা দেখতে যাওয়ার দিনটার কথা মনে পরে গেল। বাবলুদার বিয়ে হয়ে গেছে? কই, জানতে পারেনি তো? চিন্তার ঘোর ভাঙলে বলল “বাবলুদা কোথায়? আপনি কেন এখানে এসেছেন?” মহিলার চোখ ছলছল করে ওঠে। কোনরকমে কান্না চেপে বললেন “বাবলুদা তোমাকে একটু দেখতে চেয়েছে”। “দেখতে চেয়েছে মানে? ওর কি হয়েছে?” পদার গলার স্বরে সামান্য উদ্বেগ। মহিলা আর কান্না থামাতে পারলেন না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে যে কাহিনি উনি বললেন, তা শুনে পদা ভীষণ বিচলিত হয়ে পরলো। বাবলুদা বজবজ লাইনের ট্রেনে সেন্ট, আতর এই সব বিক্রি করে সংসার চালাতো। একদিন চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গিয়েছিল। তাতে তার বাঁহাতের দুটো আঙুল কাটা গেছে। হয়ত তা সত্ত্বেও সে চালিয়ে যেত, কিন্তু মুশকিল হয়েছে যে হাসপাতাল প্রাথমিক চিকিৎসা করে ছেড়ে দাওয়ার পর কাটা জায়গাটা সারছে না। বোধহয় ইনফেকশন হয়ে গেছে। গত দু-দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর আসছে আরে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে। তারই মধ্যে সে বারবার পদাকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। মাধবী প্রথমে পদার বাড়ি গিয়েছিল। সেখান থেকে এখানে ছুটে এসেছে। সব ঘটনা শুনে পদা কি বলবে বুঝতে পারছে না। বাবলুদার আজ এই দশা? তাকে যেতেই হবে। কয়েক মিনিট চুপ করে থেকে সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে বলল “আপনি আমাকে কয়েক মিনিট সময় দিন। আমি আসছি এক্ষুনি”। বলে নিজের ঘরের দিকে দৌড় লাগালো। স্যুটকেস তন্নতন্ন করে খুঁজে মাত্র বাহান্ন টাকা পাওয়া গেল। আসলে পদার কাছে টাকা পয়সা বিশেষ থাকে না। টিউশন ফি, খাবার খরচ ইত্যাদি সোজাসুজি স্কুলে জমা পরে যায়। এই কটা টাকা পদার জমানো টাকা। টাকা কটা পকেটে গুঁজে, জুতো মোজা পরে সে আবার দৌড় লাগালো। সে জানে যে ক্যাম্পাস ছেড়ে এই সময় যাওয়া নিয়মভঙ্গ করা হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে বেপরোয়া। যা হবার হবে। পরে দেখা যাবে। “চলুন”। “তুমি না বলেই চলে যাবে? কিছু হবে না?” “ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। চলুন”।

দুজনে রাস্তায় বেরোল। রবিবার দুপুরে রাস্তায় বাস কম। পদা একবার ভাবলো একটা ট্যাক্সি ডাকবে। কিন্তু পরে ভাবলো যে টাকা কটা বাঁচানো দরকার। যদি বাবলুদাকে ট্যাক্সি করে হাসপাতাল নিয়ে যেতে হয়! নারকোলডাঙ্গার বস্তিতে পৌঁছতে ঘণ্টা দুয়েক লেগে গেল শেষ অব্ধি। কিন্তু কিছু করার ছিল না। বাস থেকে নেমে মাধবী অলিগলির ভেতর দিয়ে পদাকে নিয়ে গিয়ে শেষে এক অন্ধকার ঘরে ঢোকালো। ঘরের দরজার বাইরেই একটা কর্পোরেশনের জলের কল। সেখানে অনেক ভিড়, অনেক কলরব। মাধবী ঘরে ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দিল। আলো থেকে অন্ধকারে ঢুকে অভ্যস্ত হতে পদার একটু সময় লাগলো। চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হওয়ার পর দেখলো যে ঘরের এক কোনে কিছু বাসন কোসন, জলের বালতি ইত্যাদি ছড়ানো। অন্য কোনে একটা বিছানা। সেই বিছানার এক পাশে শুয়ে আছে একটা লোক। ইতিমধ্যে মাধবী পদাকে একটা টিনের চেয়ার টেনে দিয়েছে। নিজে দাঁড়িয়ে। আগে থেকে না জানলে পদা কিছুতেই বাবলুদাকে চিনতে পারতো না। বাবলুদার কপালে হাত রাখলো পদা। কপাল পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। বাবলুদার চোখ বোজা। পদা সৌরভ রায়চৌধুরীর ছবিডাক্তার নয়, কিন্তু তার অনুভূতি তাকে জানালো যে পরিস্থিতি খুব সঙ্গিন। “একে এক্ষুনি হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া দরকার”। মাধবী এগিয়ে এসে পদার হাত ধরে ফেলল। “তুমি এসেছো এই যথেষ্ট। ওসব করার দরকার নেই। আমি বরং জলপট্টি দিই একটু। জ্বরটা নেমে গেলেই ও চোখ খুলবে। তারপর তুমি চলে যেও। রাতে না ফিরলে তোমার হস্টেলে অনেক ঝামেলা হবে”। এই দ্বিতীয়বার কোনো মেয়ে পদার হাত ধরলো। প্রথমবার সে লজ্জা পেয়েছিল। হাত ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল। আজও সেই মুহূর্তটা ভুলে উঠতে পারে নি। কিন্তু এইবার সে হাত ছাড়ালো না। উল্টে মাধবীর হাতটা শক্ত করে ধরে বলল “তা হয় না। বাবলুদা আমার দাদা। আপনি ওকে রেডি করুন। আমি ট্যাক্সি ডাকতে যাচ্ছি”।

ট্যাক্সি নীলরতন সরকার হসপিটাল এর দিকে ছুটে চলেছে। পদা ড্রাইভারের পাশে। পেছনে মাধবীর কোলে মাথা রেখে বাবলুদা শুয়ে আছে। তার এখনো হুঁশ নেই। পাড়ার লোক ডেকে কোলে করে তাকে ট্যাক্সিতে তুলতে হয়েছে। পদার মন বারবার চলে যাচ্ছে পুরনো দিনগুলোতে। এই সেই বাবলুদা যে ওকে সাইকেল চড়া শিখিয়েছিল। ঘুরি ওড়ানো শিখিয়েছিল। কি চেহারা ছিল আর এখন কি হয়েছে। মাধবীর সাথে ওর আলাপ, বিয়ে এসবই বা কবে হলো? কীভাবে হলো? এইসব নানা চিন্তা ওর মস্তিষ্কের মধ্যে পাক খেতে থাকলো। একবার পেছনে তাকালো। দেখলো মাধবী বাবলুদার ডান হাতটা শক্ত করে ধরে জানালার বাইরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো চিকচিক করছে। কান্না চেপে আছে নিশ্চয়ই। বহুদিন আগে আর একজনের চোখ এরকম চিকচিক করতে দেখেছিল। সাদা কালো এই জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়! ভাবে পদা। কোথায় সেই সিনেমা আর কোথায় এই বাস্তব জীবন। বাবা ঠিকই বলেছিল। পদা যেন হঠাৎই আজ বড় হয়ে উঠলো!

ছবির সংরচনা ড্যাল-ই-এর মাধ্যমে এবং প্রোক্রিয়েট দিয়ে স্কেচ করেছেন সৌরভ রায়চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব

আরো পড়ুনসাদা কালো – ১ম পর্ব